দুর্লভ খনিজের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল পশ্চিমা দেশগুলো

দুর্লভ খনিজের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল পশ্চিমা দেশগুলো

আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুর্লভ খনিজের সরবরাহে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে পশ্চিমা দেশগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে।

দুর্লভ খনিজ নামে পরিচিত ১৭টি ধাতু প্রকৃতপক্ষে খুব বিরল নয়। ভূ-পৃষ্ঠে এগুলো তুলনামূলকভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এবং কম ঘনত্বে পাওয়া যায় বলেই এগুলো উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করা কঠিন ও ব্যয়বহুল। এসব খনিজ উন্নত অস্ত্র, স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, উইন্ড টারবাইন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়।

বিজ্ঞাপন

২০১০ সালে চীন ও জাপানের মধ্যে পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত দ্বীপ নিয়ে বিরোধের সময় বেইজিং জাপানে গুরুত্বপূর্ণ দুর্লভ খনিজের রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল। ওই ঘটনার পর বিশ্বের অন্যান্য দেশ সরবরাহের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক হলেও পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়নি। বর্তমানে বিশ্বে দুর্লভ খনিজ উত্তোলনের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রায় ৯০ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যিক সংঘাতের সময় চীন আবারও দুর্লভ খনিজ রপ্তানি সীমিত করার উদ্যোগ নেয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা তৈরির দিকে দ্রুত এগোতে শুরু করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মজুত গড়ে তুলতে ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এর আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর দেশটির একটি দুর্লভ খনিজ কোম্পানিতে বড় বিনিয়োগকারী হয়ে ওঠে।

তবে চীন থেকে সরবরাহ সরিয়ে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়াও সহজ নয়। দুর্লভ খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ কারণে একসময় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের উৎপাদন কমিয়ে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নতুন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শুধু খনি খনন করলেই হবে না; উৎপাদকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য বাজার এবং মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।

সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণের প্রতিযোগিতায় এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েই ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডের মতো অঞ্চলের দিকে নজর দিচ্ছে। এতে এসব দেশে নতুন খনি ও উত্তোলন কার্যক্রমের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুরোনো খনিজ পুনর্ব্যবহার, খনি থেকে বের হওয়া বর্জ্য থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান আহরণ এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে চাপ কমানো সম্ভব হলেও শুধু পুনর্ব্যবহার দিয়ে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় কমিশন ও যুক্তরাজ্যসহ ৫৪টি অংশীদারকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজবিষয়ক একটি জোট গঠন করেছে। দুর্লভ খনিজের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা অপরিহার্য। তবে ইউরোপের জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের বাণিজ্যনীতি ও আন্তর্জাতিক নীতিতে অনিশ্চয়তা থাকায় ইউরোপকে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

ইউরোপ ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের ‘ক্রিটিক্যাল র ম্যাটেরিয়ালস অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ফ্রান্সে চীনের বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুর্লভ খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা রয়েছে এবং ব্রাজিলের খনিজ সম্পদ নিয়ে ইউরোপীয় পর্যায়ে চুক্তির আলোচনা চলছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

তেল ও গ্যাসের মতো দুর্লভ খনিজও এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক চাপ বা বাণিজ্যিক সংঘাতের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই মজুত গড়ে তোলা, নতুন সরবরাহ উৎস তৈরি, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ—সবকিছু একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন খনি অনুসন্ধানের কারণে পরিবেশের ওপর যে চাপ তৈরি হবে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন