হুথিরা যেভাবে সৌদি আরবের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠল

হুথিরা যেভাবে সৌদি আরবের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠল
ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করছে। এর পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াই, ইরানের প্রভাব বিস্তার এবং আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন।

রোববার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে হুথিদের ব্যাপক হামলার পর কয়েকটি শহরে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, তারা অন্তত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। খামিস মুশাইতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আবহা, তাইফ, নামাস ও জাজানেও সতর্কতা জারি করা হয়।

বিজ্ঞাপন

রিয়াদে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিত পরিসরে চালুর প্রস্তুতির মধ্যেই নতুন হামলার ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দরটিকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে হুথিরা।

কেন হামলা বাড়াচ্ছে হুথিরা

ইয়েমেনের অভ্যন্তরে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া এবং সৌদি আরবের সামরিক তৎপরতা হুথিদের হামলা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যত বড় ধরনের সীমান্ত সংঘাত বন্ধ রেখেছিল। তবে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করাই হুথিদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

হুথিদের মূল লক্ষ্য কী

হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও উত্তরাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। একই সঙ্গে দেশটির ভবিষ্যৎ সরকারে প্রভাব বিস্তার, নিয়ন্ত্রিত এলাকার বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং সৌদি আরবের কাছ থেকে রাজনৈতিক ছাড় আদায় করতে চায়।

এছাড়া লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাবের কাছে নিজেদের অবস্থান কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোও তাদের কৌশলের অংশ।

ইরান কি হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করছে

ইরান হুথিদের অস্ত্রপ্রযুক্তি, সামরিক দক্ষতা ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা বেড়েছে।

তবে হুথিরা কেবল ইরানের নির্দেশে পরিচালিত কোনো গোষ্ঠী নয়। ১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে তাদের আন্দোলনের সূচনা হয়। ২০১৪ সালে সানা দখলের পর তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি গড়ে তোলে। ফলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও ইয়েমেনে ক্ষমতা সংহত করার নিজস্ব লক্ষ্য তাদের রয়েছে।

কেন বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলা

সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, পাইপলাইন ও জ্বালানি রপ্তানি টার্মিনাল দেশটির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনায় হামলা চালিয়ে হুথিরা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করা, নিরাপত্তা ব্যয় বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরির চেষ্টা করছে।

সৌদি আরবের প্রচলিত সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দিতে না পারলেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে তারা।

বাব আল-মান্দেব কেন গুরুত্বপূর্ণ

লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল বাব আল-মান্দেব ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সুয়েজ খালকেন্দ্রিক বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় টার্মিনাল থেকে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে সৌদি আরবের বিকল্প রপ্তানি পথ হিসেবে লোহিত সাগরের গুরুত্ব বাড়ে। এই দুই নৌপথই ঝুঁকির মুখে পড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ, জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।

সৌদি আরব কি হামলা ঠেকাতে পারবে

সৌদি আরবের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে সক্ষম। তবে বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে বিমানবন্দর, শহর ও জ্বালানি স্থাপনা রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ। সব হামলা ঠেকানো সম্ভব না হওয়ায় প্রতিটি আক্রমণই বেসামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

সংঘাতের অবসান কীভাবে সম্ভব

সংঘাত কমাতে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ, বন্দর ও বিমানবন্দরের ওপর বিধিনিষেধ এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে সমঝোতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরবের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ জোরদার হতে পারে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ছড়িয়ে পড়লে অন্য দেশও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

মূলত, সামরিক হামলার মাধ্যমে রাজনৈতিক ছাড় আদায় ও ইয়েমেনে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় হুথিরা। তবে এই কৌশল তাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে—তা নির্ভর করছে আগামী দিনের সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

সূত্র: গালফ নিউজ

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন