যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কিনছে ভারত

যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা কিনছে ভারত
ছবি: এনডিটিভি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো এক ধাপ এগিয়ে নিল ভারত। মার্কিন ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ‘জ্যাভেলিন’ কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত এই ক্ষেপণাস্ত্র ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংসের পাশাপাশি সুরক্ষিত অবস্থানেও আঘাত হানতে পারে।

শুক্রবার মার্কিন দূতাবাস জানায়, জ্যাভেলিন কেনার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ফরেন মিলিটারি সেলস (এফএমএস) প্রক্রিয়ার আওতায় এই চুক্তি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘এটা একটি বড় খবর!’

তার ভাষায়, যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত জ্যাভেলিন কেনার এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র-ভারত প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বড় অগ্রগতি।

তার মতে, চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে যৌথ উৎপাদনের পথও খুলে দিতে পারে।

ভারতীয় প্রতিরক্ষা সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬০টি জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের চুক্তির মূল্য প্রায় ২৯২ কোটি রুপি। এই কেনাকাটা জরুরি ক্রয়ক্ষমতার আওতায় করা হয়েছে। তবে মার্কিন দূতাবাস বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির মূল্য ও সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

জ্যাভেলিন কীভাবে কাজ করে

জ্যাভেলিন মূলত কাঁধে বহনযোগ্য ট্যাংকবিধ্বংসী নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা। একজন সেনাসদস্য এটি বহন ও উৎক্ষেপণ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন ও আরটিএক্সের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয় এই অস্ত্র। মার্কিন সেনাবাহিনী ও মেরিন কোর ছাড়াও বিশ্বের কয়েকটি দেশের সামরিক বাহিনী এটি ব্যবহার করে।

জ্যাভেলিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট’ ব্যবস্থা। অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর নিক্ষেপকারীকে আর সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না। ক্ষেপণাস্ত্র নিজেই লক্ষ্য অনুসরণ করে।

এতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর সেনাসদস্য দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন। শত্রুপক্ষ পাল্টা হামলা চালানোর আগেই তিনি নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার সুযোগ পান।

জ্যাভেলিন ওপর থেকে ট্যাংকের তুলনামূলক কম সুরক্ষিত অংশে আঘাত হানতে পারে। এ ধরনের আঘাতের ফলে ট্যাংকের ওপরের সুরক্ষা ভেদ করে ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটানোর সুযোগ তৈরি হয়।

এই ক্ষেপণাস্ত্র শুধু ট্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নয়। সাঁজোয়া যান এবং বাংকারের মতো সুরক্ষিত অবস্থানও এর লক্ষ্য হতে পারে। ফলে প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি শহরাঞ্চলেও এর ব্যবহার রয়েছে।

অস্ত্রটি তুলনামূলকভাবে বহনযোগ্য হওয়ায় সেনাসদস্যরা দ্রুত এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে যেতে পারেন। যুদ্ধক্ষেত্রে ‘গুলি করে দ্রুত অবস্থান বদলানো’—এই সক্ষমতা জ্যাভেলিনের অন্যতম সুবিধা।

ভারতের কেন এই অস্ত্র

ভারতের জন্য জ্যাভেলিন কেনার উদ্যোগ নতুন নয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

নিজস্ব প্রযুক্তিতে ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজও করছে ভারত। তবে দেশীয় ব্যবস্থাটি এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যেই দ্রুত যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়াতে বিদেশি অস্ত্র সংগ্রহ করছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

সাম্প্রতিক এই কেনাকাটা জরুরি ক্রয়ক্ষমতার আওতায় হয়েছে। প্রতিরক্ষা সূত্র বলছে, গত বছরের ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর পর ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে এই ধরনের দ্রুত ক্রয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জরুরি ক্রয়ক্ষমতার আওতায় প্রতি সরঞ্জামের ক্ষেত্রে ৩০০ কোটি রুপি পর্যন্ত কেনাকাটার সুযোগ রয়েছে। সেই সীমার মধ্যেই জ্যাভেলিন কেনার চুক্তি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

চুক্তির সরবরাহ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শেষ নাগাদ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে বলে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে বিভিন্ন সরঞ্জামের সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

আগেও জ্যাভেলিন কেনার অনুমোদন

ভারতকে জ্যাভেলিন বিক্রির সম্ভাব্য অনুমোদন এর আগেই দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ভারতকে জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন দেয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা সহযোগিতা সংস্থার (ডিএসসিএ) তথ্য অনুযায়ী, ওই সম্ভাব্য বিক্রির আনুমানিক মূল্য ছিল ৪৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার। প্রস্তাবে ছিল ১০০টি এফজিএম-১৪৮ জ্যাভেলিন রাউন্ড, একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৫টি লাইটওয়েট কমান্ড লঞ্চ ইউনিট। প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সহায়ক সরঞ্জামও এর আওতায় ছিল।

তবে এটি ছিল সম্ভাব্য ফরেন মিলিটারি সেলস ( এফএমএস )-এর অনুমোদন। ২০২৬ সালের নতুন চুক্তির মূল্য বা সংখ্যা হিসেবে ওই ৪৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার বা ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্রকে সরাসরি উল্লেখ করা ঠিক হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র-ভারত প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন ধাপ

জ্যাভেলিন চুক্তি শুধু একটি অস্ত্র কেনার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়টিও রয়েছে।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর বলেছেন, এই চুক্তি দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে কাজের নতুন সুযোগ তৈরি করবে। ভবিষ্যতে যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে।

তার মতে, দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এখন আরো গভীর ও সক্ষম হয়ে উঠছে।

গত বছরও দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো গভীর করার জন্য ১০ বছরের একটি কাঠামোতে সম্মত হয়েছিল। ফলে জ্যাভেলিন চুক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সামরিক খাতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা দেশগুলোর তালিকায় ভারত পঞ্চম। অস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রেও দেশটির অবস্থান শীর্ষে।

ফলে জ্যাভেলিনের মতো আধুনিক ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র সংগ্রহ ভারতের সামরিক সক্ষমতা আধুনিকায়নের ধারারই অংশ। একই সঙ্গে এটি নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরো ঘনিষ্ঠ করারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি, রয়টার্স, দ্য ইকোনমিক টাইমস, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন