‘ঐ আকাশ স্পর্শ করা চূড়া তোমার’
হে হিমালয়!
প্রকৃতির আয়না তুমি, মহিমায় অনন্য
ও অজয়।’
মহাকবি আল্লামা ইকবাল ‘হিমালয়’ কবিতায় এই পর্বতের মহিমাকে চমৎকার শব্দে এভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
হিমালয় চূড়া মাউন্ট এভারেস্ট জয়ী প্রথম মানব এডমন্ড হিলারির উক্তি, ‘আমরা পর্বতকে জয় করি না, বরং নিজেদের ভেতরের ভয় ও অহংকারকে জয় করি।’
যুগ যুগ ধরে হিমালয় শুধু বরফাবৃত কোনো পাথরের স্তূপ নয়, বরং মানুষের আধ্যাত্মিকতা, সাহস আর অসীম কল্পনার এক চিরন্তন উৎস। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখে এটি যেন দেবতার এক ‘স্থির, নিশ্চল, ধ্যানগম্ভীর’ রূপ, যা মানুষকে শেখায় অন্তরের গভীরে ডুব দিতে। আবার আল্লামা ইকবালের কাছে এই পর্বত প্রকৃতির এক জীবন্ত আয়না।
হিমালয় শুধু কবিদেরই আবেগপ্রবণ করেনি বরং যুগে যুগে জর্জ ম্যালোরি কিংবা এডমন্ড হিলারির মতো দুঃসাহসী পর্বতারোহীদের ডেকেছে এক চরম আত্মআবিষ্কারের টানে। তারা প্রমাণ করেছেন, হিমালয়ের চূড়ায় ওঠার লড়াইটি আসলে পাহাড় জয়ের নয়, বরং মানুষের নিজের ভেতরের ভয়কে জয় করার গল্প। হিমালয় তাই একাধারে প্রকৃতির মহাকাব্য এবং মানুষের অপরাজেয় স্বপ্নের এক জীবন্ত প্রতীক।
ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালোরিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেন এভারেস্ট চড়তে চান? তার জবাব ছিল, `Because its there (কারণ এটি সেখানে দাঁড়িয়ে আছে)। তিন শব্দের উত্তরটি আজও মানুষকে রোমাঞ্চিত করে।
হিমালয়কে বলা হয়, পৃথিবীর মুকুট। কখনো নীল আকাশের বুকে ধবধবে সাদা বরফের মুকুট, কখনো ভোরের প্রথম সূর্যের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনাগলা রূপ, আবার কখনো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যাওয়া রহস্যময় হাতছানি। সবুজ উপত্যকা, পাইন দেবদারুর বন, শান্ত পাহাড়ি হ্রদ এবং পাইন বনের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া হিম শীতল বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ মিলে এক জীবন্ত স্বর্গ, হিমালয়। সাহিত্যের ভাষায় বলতে গেলে, ‘হিমালয় হলো পৃথিবীর এক শ্বেতশুভ্র রাজমুকুট, যা অনন্ত নীরবতায় আকাশ ছুঁয়ে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের জানান দেয়।’
এই হিমালয় কেবল তার ২,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভৌগোলিক সীমানায় কিংবা মাউন্ট এভারেস্টের মতো পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলোর উচ্চতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর বিশালত্ব লুকিয়ে আছে তার অটল গাম্ভীর্যে। এটি এমন এক পর্বতমালা যা এশিয়ার জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে, সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রের মতো মহীসৃজ নদীগুলোর জন্ম দেয় এবং এক বিশাল প্রাচীর হয়ে পৃথিবীকে আগলে রাখে। এর বিশালত্ব মানুষের অহংকারকে গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রকৃতির সামনে তাকে বিনীত হতে শেখায়। অনন্ত রূপের খেলাই তার সৌন্দর্য।
কিন্তু এই হিমালয় এখন ভালো নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে হিমালয় পর্বতমালা। এর ওপর ধেয়ে আসছে ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তীব্র বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে দ্বিগুণ গতিতে হিমবাহ গলে যাওয়া ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা হিমালয়কে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা ও ক্ষতিপূরণ দাবি
প্রায় দু’বছর আগে নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলাম। যমুনা নামে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণী ছিল আমাদের গাইড। কাঠমান্ডু থেকে ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে নগরকোট ভিউ টাওয়ারে তিনি আমাদের হিমালয় দেখাতে নিয়ে যান। কাঠমান্ডুতে আসা প্রায় সব পর্যটকেরই পছন্দ এই পাহাড়ি অঞ্চল। কাঠমান্ডু শহর থেকে হিমালয় দেখার জন্য এটিই জনপ্রিয় এলাকা। আবহাওয়া পুরোপুরি পরিষ্কার না থাকায় সেদিন আমরা এভারেস্টের চূড়া ভালোভাবে দেখতে পাইনি, তবে হিমালয়ের অন্যান্য পর্বত আমাদের মুগ্ধ করেছে।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী যমুনা সেদিন আমাদের জানিয়েছিলেন, হিমালয় নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্বেগের কথা। তিনি বলেছিলেন, হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলছে। হিমবাহগুলোর অবস্থা ভালো নয়। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মাত্র দু’বছরের মধ্যেই এর সত্যতা পাওয়া গেল। হিমালয়ের বুকে নেমে এলো দুর্যোগ। গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকা ধ্বংসযজ্ঞে রূপ নেয়। এখন পর্যন্ত দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাঁচ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
এই দুর্যোগের জন্য নেপাল জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রধানত দায়ী করে বিশ্বের তিন কার্বন নিঃসরণকারী দেশ চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল স্পষ্ট বলেছেন, এই দুর্যোগ কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি ফল। তাই নেপাল একে কোনো ‘দাতব্য সাহায্য বা ত্রাণ’ হিসেবে না দেখে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে দাবি করছে। নেপালের এই ক্ষতিপূরণের দাবি জলবায়ু নীতিমালার আলোকে অত্যন্ত যৌক্তিক। বৈশ্বিক গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের ভূমিকা ০.১ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়ের প্রথমসারির ভুক্তভোগী তারা। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, গত ৩০ বছরে হিমালয় তার বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আয়তন হারিয়েছে এবং গত এক দশকে গলনের গতি ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে তুষারপাতের পরিবর্তে বৃষ্টি হচ্ছে, যা মাটিকে অস্থিতিশীল করে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা বাড়াচ্ছে। নেপালের অর্থমন্ত্রী ও পরিবেশমন্ত্রী যৌথভাবে জাতিসংঘের ‘জলবায়ু লস অ্যান্ড ডেমেজ ফান্ড’ থেকে জরুরি অর্থ সহায়তা চেয়েছেন। জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উপস্থিত হয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিষয়টি তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কারণ হিমবাহ ধস বিপর্যয়ে নেপালের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অবকাঠামোর যে ক্ষতি হয়েছে তা পুনর্গঠন করতে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ (৪-৫ বিলিয়ন ডলার) প্রয়োজন, যা দেশটির নিজস্ব ক্ষমতার বাইরে।
সমন্বিত পরিকল্পনা কেন প্রয়োজন
হিমালয়ের সংকট একক কোনো দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানকে একসঙ্গে আঞ্চলিক ও অববাহিকাভিত্তিক (Basin wise) সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। হিমালয়, নদী, পাহাড়কে রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে। প্রাকৃতিক বিষয়কে রাজনৈতিক সীমান্তের ভিত্তিতে চিন্তা না করে বরং সব দেশের জন্য কল্যাণ এমন সমন্বিত চিন্তায় যেতে হবে। নদী কোনো রাজনৈতিক সীমান্ত চেনে না। পানি যেমন একটি মৌলিক মানবাধিকার। ভাটির দেশ বাংলাদেশ কিংবা উজানের দেশ ভারত, উভয় দেশেরই বেঁচে থাকার জন্য পানি প্রয়োজন। পানিকে তাই রাজনৈতিক দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে তা মানবতার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। জলবায়ু পরিবর্তজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো নির্দিষ্ট দেশের ক্ষতি করবে না, এটি পুরো অববাহিকাকে ধ্বংস করবে। এর খেসারত সব দেশকেই বহন করতে হবে। এজন্য অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা, ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক জলাধার নির্মাণ, জলবায়ু অভিযোজন ইত্যাদি নিয়ে দেশগুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনায় আসতে হবে।
হিমালয় দক্ষিণ এশিয়ার পানির প্রধান উৎস
হিমালয় পর্বতমালা হলো দক্ষিণ এশিয়ার পানির প্রধান উৎস, যাকে এ অঞ্চলের পানির টাওয়ার বলা হয়। হিমালয় থেকে সৃষ্ট এবং এর বরফগলা পানিতে পুষ্ট নদীগুলো ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তানের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা সচল রেখেছে।
গঙ্গা-পদ্মা হিমালয়ের ‘গঙ্গোত্রী হিমবাহ’ থেকে সৃষ্ট। ভারত হয়ে বাংলাদেশে পদ্মা নামে প্রবেশ করেছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা তিব্বতের মানস সরোবরের কাছে ‘চিমায়ুংদুং হিমবাহ’ থেকে সৃষ্ট। এটি ভারত (আসাম) হয়ে বাংলাদেশে যমুনা নামে প্রবাহিত। মেঘনা (বরাক-সুরমা-কুশিয়ারা) মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি অঞ্চলের মাধ্যমে হিমালয়তন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত।
কোসি (সপ্তকোসি) অত্যন্ত তীব্র স্রোতের নদী, যা নেপাল থেকে ভারতে প্রবেশ করে গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে। গন্ডকী ও কর্নালী নেপালের প্রধান নদী অববাহিকা, যা হিমালয়ের হিমবাহের পানিতে সারা বছর সচল থাকে।
মানস ও সংকোষ ভুটানের হিমালয় অংশ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের আসাম হয়ে বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিশেছে। ওয়াংছু ও পুনাৎসদছু ভুটানের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল উৎস।
সিন্ধু তিব্বতের কৈলাশ পর্বতের হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের লাদাখ হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে। এই নদী পাকিস্তানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তেমনি ঝিলাম, চেনাব, রাভি ও শতদ্রু সিন্ধু নদের প্রধান উপনদীসমূহ যা হিমালয় থেকে উৎপন্ন।
তাই হিমালয়ের সংকটের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার ৫টি দেশই সমস্যায় পড়বে। হিমবাহ ধস হলে আকস্মিক বন্যা তো হবেই, হিমবাহের বরফ গলে পানি কমে গেলে এ অঞ্চলের ২০০ কোটি মানুষের জীবনযাত্রাই ব্যাহত হবে। সিন্ধু নদের উদাহরণই যথেষ্ট। পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমি সিন্ধু নদের সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। হিমালয় ও কারাকোরামের হিমবাহ গলে গেলে সিন্ধু নদ শুকিয়ে যাবে, যা পাকিস্তানে চরম দুর্ভিক্ষ ও গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
হিমালয়কে যেভাবে চেনা যায়
হিমালয় হলো পৃথিবীর সর্বোচ্চ এবং অন্যতম বৃহৎ এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্বতমালা। সাদা বরফে ঢাকা সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, সুবিশাল হিমবাহ, গভীর উপত্যকা, পাইন-দেবদারুর সবুজ বন এবং আলপাইন তৃণভূমি হিমালয়কে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য দান করেছে। হিমালয়ের লোভনীয় দিক হলো পর্বতারোহণ ও অ্যাডভেঞ্চার। এভারেস্ট বা কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় পা রাখা পৃথিবীর সব পর্বতারোহীর জন্য এক পরম স্বপ্ন। এছাড়া হিমালয়ের শান্ত পরিবেশ, ট্র্যাকিং এবং রহস্যময় ‘ইয়েতি’ (তুষারমানব)-এর গল্প পর্যটকদের তীব্রভাবে টানে।
হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্ট ৮,৮৪৮ মিটার উঁচু। পৃথিবীর সর্বোচ্চ ১৪টি চূড়ার সবকটিই এই অঞ্চলে অবস্থিত। এটি শুধু একটি পর্বত নয়, বরং এশিয়ার আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং গঙ্গা, সিন্ধু ও ব্রহ্মপুত্র, ইয়াংসিকিয়াং এবং মেকংসহ প্রধান নদীগুলোর উৎস। এই নদীগুলোর ওপর প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল।
হিমালয় পর্বতমালার মোট আয়তন প্রায় সাড়ে ৭ লাখ বর্গ কিলোমিটার। এটি লম্বায় পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রায় ২,৪১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং প্রস্থে প্রায় ১৫০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। আজ থেকে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি বছর আগে হিমালয় পর্বতমালা সৃষ্টি শুরু হয়। ভূত্বকের মানদণ্ডে এই পর্বতমালাকে পৃথিবীর সবচেয়ে কনিষ্ঠ বা তরুণ পর্বতমালা হিসেবে গণ্য করা হয়।
আজ থেকে প্রায় ৫ কোটি বছর আগের কথা। যখন পৃথিবীর বুকে ডাইনোসরদের যুগ শেষ হয়ে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের রাজত্ব শুরু হচ্ছে তখন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। প্রাগৈতিহাসিক ‘টেথিস সাগর’-এর বুক চিরে ভারতের টেকটোনিক প্লেটটি এসে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মারে ইউরেশীয় প্লেটকে। দুটি ভূখণ্ডের সেই মহাকর্ষীয় লড়াইয়ে সমুদ্রের তলদেশ দুমড়ে-মুচড়ে ভাঁজ খেয়ে আকাশের দিকে উঠতে শুরু করল। জন্ম নিল হিমালয়। ভূবিজ্ঞানীদের ভাষায় এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ‘তরুণ’ বা কনিষ্ঠ পর্বতমালা। এই সৃষ্টির প্রক্রিয়া কতটা জীবন্ত, তার প্রমাণ মেলে যখন অভিযাত্রীরা এভারেস্টের প্রায় ২৯ হাজার ফুট উঁচুতে খুঁজে পান প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম (ফসিল)। সেই ধাক্কা আজও থামেনি। হিমালয় প্রতি বছর ৫ মিলিমিটার করে ওপরের দিকে বাড়ছে।
হিমালয়কে শুধু পর্বত বললে ভুল হবে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীরা উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর পর হিমালয়কে ডাকেন ‘দ্য থার্ড পোল’ বা পৃথিবীর ‘তৃতীয় মেরু’ হিসেবে। দুই মেরুর বাইরে হিমালয়েই জমে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফের স্তূপ। এ জন্যই একে এশিয়ার বিশাল ‘পানির ট্যাংক’ বলা হয়। এখান থেকে জন্ম নেওয়া গঙ্গা, সিন্ধু ও ব্রহ্মপুত্রের মতো প্রধান ১০টি নদী বাঁচিয়ে রেখেছে এই মহাদেশের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। পাশাপাশি এই হিমালয় দক্ষিণ এশিয়ার এক ‘শাশ্বত প্রহরি’। সাইবেরিয়ার হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা বাতাসকে এই হিমালয় যদি বুক পেতে আটকে না দিত তাহলে বাংলাদেশ কিংবা ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আজ মরুভূমি কিংবা বরফজমা এক মরণ-উপত্যকায় পরিণত হতো। ভারত মহাসাগরের মৌসুমি বায়ুকে পথ আটকে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ঘটায় এই হিমালয়, যার ওপর ভর করে টিকে আছে আমাদের কৃষি।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আকাশে ওড়ার এই যাত্রাপথে হিমালয় নিজের বুকে তৈরি করেছে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ‘জীববৈচিত্র্যের হটস্পট।’ এর ঘন চিরহরিৎ অরণ্য থেকে শুরু করে আলপাইন তৃণভূমি পর্যন্ত লুকিয়ে আছে ১০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ৯০০-এর বেশি প্রজাতির পাখি এবং ৩০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এখানে দেখা মেলে বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় তুষার চিতা (Snow Leopard), লাল পান্ডা (Red Panda), হিমালায়ান তাহর এবং কস্তুরী মৃগের মতো প্রাণী। হিমালয়ের পূর্ব অংশ তথা ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাংশে বেশি বৃষ্টিপাতের কারণে চিরহরিৎ ও গহিন বনে ঢাকা এবং জীববৈচিত্র্য এখানে সবচেয়ে বেশি।
হিমালয়ের হিমবাহ পরিস্থিতি
হিমালয় ও হিন্দুকুশ অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার রয়েছে যা মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফের উৎস। এ কারণে আগেই বলেছি, একে পৃথিবীর ‘তৃতীয় মেরু’ বলা হয়। হিমালয়ের দুর্গমতা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বিজ্ঞানীদের সব হিমবাহ নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয় না। মাত্র ৩৮টি হিমবাহের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও সরাসরি তথ্য বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে। বড় হিমবাহের মধ্যে রয়েছে সিয়াচেন হিমবাহ, গঙ্গোত্রী হিমবাহ, খুস্তু হিমবাহ, জেমু হিমবাহ, বালতোরো হিমবাহ। বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্ট্রোগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএম ওডি) এবং বিশ্ব হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ডব্লিউজিএমএম মূলত নির্দিষ্ট বেঞ্চমার্ক হিমাবহ নিয়ে কাজ করছে। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক ‘এইচকেএইচ গ্লেসিয়ার আউটলুক ২০২৬’ এবং জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী হিমালয়ের হিমবাহগুলোর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ২০০০ সালের পর থেকে হিমালয়ের বরফ গলায় গতি প্রায় দ্বিগুণ হারে হচ্ছে। গত তিন দশকে মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩০ শতাংশ হারিয়ে ফেলেছে। বরফ গলে হিমবাহের ওপরে ও নিচে অসংখ্য বিপজ্জনক হ্রদ তৈরি হচ্ছে। গত আগস্ট মাসে নেপালের লাংতাং লিরুং চূড়ায় হিমবাহ ও পাথরের ভয়াবহ ধসে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ৪ বর্গ কিলোমিটারের চেয়ে ছোট হিমবাহগুলো দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। ২০ শতকের শেষভাগের তুলনায় এই শতকের শেষে হিমালয়ের হিমবাহগুলোর গলনের হার প্রায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
হিমালয় নিয়ে গবেষণা
আগস্টে নেপাল-চীন সীমান্তের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর পরিবেশ বিজ্ঞান ও জলবায়ুর ক্ষেত্রে কয়েকটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। আইসিআইএমওডির একদল হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানী তাদের গবেষণা তথ্য উল্লেখ করে জানিয়েছেন, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিমালয় তার ১২ শতাংশ আয়তন এবং ৯ শতাংশ স্থায়ী বরফের রিজার্ভ হারিয়েছে। ২০০০ সালের পর বরফ ক্ষয়ের হার শতভাগ অর্থাৎ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালে হিমালয়ের বরফের আচ্ছাদন দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে ২৭.৮ শতাংশের নিচে। যুক্তরাষ্ট্রের লাফবরো ইউনিভার্সিটির ভূবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড্যানিয়েল পারসন্স ও নেপালের ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ডিজাস্টার স্টাডিজের পরিচালক ড. বসন্ত রাজ অধিকারীর গবেষণায় বলা হয়, হিমালয়ের ঝুলন্ত হিমবাহ ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভারতের অলকান্দা অববাহিকাতেই ২১৯টি ঝুঁকিপূর্ণ ঝুলন্ত হিমবাহ চিহ্নিত করা হয়েছে যা হরপা বান (আকস্মিক বন্যা) শুধু নয়, ক্যাসকেডিং ডিজেস্টার বা বহুমুখী বিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে পারে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত ব্ল্যাক কার্বন ও বায়ুদূষণ সংক্রান্ত এক গবেষণায় বলা হয়, শুধু বৈশ্বিক তাপমাত্রা নয়, দক্ষিণ এশিয়ার গাড়ি ধোঁয়া ও কলকারখানার ‘ব্ল্যাক কার্বন’ বা ঝুলকালি বাতাসে উড়ে গিয়ে হিমালয়ের সাদা বরফের ওপর জমছে। এই কালো আস্তরণ সূর্যের আলো শোষণ করে বরফ গলার প্রক্রিয়াকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, বায়ুদূষণ কমাতে পারলে হিমালয়ের বরফ গলার হার তাৎক্ষণিকভাবে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
হিমালয় নিয়ে বড় গবেষণা ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি
বিজ্ঞানীদের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, হিমালয় এখন উদ্বেগের নাম। বর্তমানে হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড, অক্সফোর্ড কিংবা এমআইটির মতো বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ভূবিজ্ঞানীদের গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু এই হিমালয়। বিজ্ঞানীদের ফিজিক্স বেসড সিমুলেশন ও স্যাটেলাইট রাডার প্রযুক্তি গবেষণায় উঠে এসেছে শিউরে ওঠার মতো তথ্য। হিমালয়ের নিচে থাকা মেইন হিমালায়ান থ্রাস্ট (এমএইচটি) নামক প্রধান ফাটল বা ফন্ট লাইনটি বর্তমানে সম্পূর্ণ ‘লকড’ বা আটকে থাকা অবস্থায় আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলো বিশেষ করে ২০২৫-২৬ সালের গবেষণায় ইনসার স্যাটেলাইট রাডার এবং উন্নত ভূতাত্ত্বিক মডেল ব্যবহার করে ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হিমালয় বেল্ট পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, হিমালয়ের মধ্যাঞ্চলের ‘সিসমিক গ্যাপ’ বা ভূকম্পনীয় শান্ত এলাকায় গত ৫০০ থেকে ৭০০ বছর ধরে কোনো বড় ভূমিকম্প হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে সেখানে যে পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হয়েছে তা মুক্তি পেলে ৮.৮ মাত্রার দুটি বিশাল মেগা ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। আর হিমালয়ে এই ভূমিকম্প হলে সেটা ভূকম্পনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি একসঙ্গে শত শত তুষার ধস, ভূমি ধস এবং হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন ও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজি, ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি ভারত, ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে, আর্থ অবজারভেটরি অব সিঙ্গাপুর, ন্যাশনাল সিসমোলজিক্যাল রিসার্চ সেন্টার নেপাল, ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন জলবায়ু পরিবর্তন, গ্লেসিয়ার গলা, ভূকম্পন ইত্যাদি বিষয়ে হিমালয়ে গবেষণা চলমান রেখেছে। ড. রজার বিলহাম, ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডার (যুক্তরাষ্ট্র)-এর অধ্যাপক ও ভূবিজ্ঞানী তিনি। হিমালয় অঞ্চলে ভূমিকম্প গবেষণার পথিকৃৎ। তিনি কয়েক দশক ধরে জিপিএস ডেটা ব্যবহার করে প্রমাণ করেছেন যে, হিমালয়ের মধ্যাঞ্চলে এক বা একাধিক ৮ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হওয়ার মতো শক্তি জমে আছে। নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় হিমালয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ঘটে যাওয়া হিমবাহ ধস ও বিপর্যয় নিয়ে ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকদের ফাইন্ডিংস বিশ্ব মিডিয়াতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ডিজাস্টার স্টাডিজের পরিচালক ও ভূঝুঁকি বিশেষজ্ঞ ড. বসন্ত রাজ অধিকারী জানান, লাংতাং লিরুং অঞ্চলে হিমবাহের বিশাল বরফ ও পাথরের স্তূপ ধসে যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়েছিল, তা হিরোশিমা নিক্ষিপ্ত পরমাণু বোমার চেয়েও ধ্বংসাত্মক ও শক্তিশালী ছিল। হিমালয়ের ইতিহাসে এটা ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের প্যানেল তৈরি করে গবেষণার মাধ্যমে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
লেখক: সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


