রাশিয়া ও ইরানের বর্তমান সম্পর্ককে অনেকেই একটি ‘কৌশলগত জোট’ মনে করলেও, বিশ্লেষকদের মতে এটি মূলত একটি সাময়িক বোঝাপড়া। তবে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংকটের মধ্যে এই অংশীদারত্ব এখন এক বড় অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে।
ঐতিহাসিক তিক্ততা
দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস বেশ জটিল। প্রায় ১৯৭ বছর আগে (১৮২৯ সালের ফেব্রুয়ারি) তেহরানে ক্ষুব্ধ জনতার হাতে রাশিয়ার জাদরেন আমলের রাষ্ট্রদূত আলেকসান্দর গ্রিবোয়েদভ নিহত হন। ১৮২৬-২৮ সালের রুশ-পারস্য যুদ্ধে ইরান হেরে যাওয়ার পর রাশিয়ার চাপিয়ে দেওয়া বিশাল জরিমানা আদায় এবং রুশ দূতাবাসে আশ্রিত আর্মেনীয় শরণার্থীদের ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানানোর জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। তৎকালীন পারস্য (বর্তমান ইরান) রাশিয়ার প্রতিশোধ এড়াতে বিখ্যাত ‘পার্সিয়ান ডায়মন্ড’ জার প্রথম নিকোলাসকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিল, যা আজও মস্কোতে রয়েছে।
১৯ শতক জুড়ে রাশিয়া পারস্যের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো একের পর এক দখল করে এবং দেশটিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে ‘গ্রেট গেম’-এর একটি ক্ষমতাহীন ঘুঁটিতে পরিণত করে। এমনকি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের নতুন ধর্মতাত্ত্বিক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নাস্তিক সোভিয়েত রাশিয়াকে ‘ছোট শয়তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।
স্বার্থের অংশীদারত্ব
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ভূ-রাজনীতিতে পরিবর্তন আসে। রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব ধরে রাখতে ইরানকে একটি অপরিহার্য মিত্র হিসেবে দেখতে শুরু করে এবং জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বিলম্বিত বা অবরুদ্ধ করতে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে। বিনিময়ে তেহরান রুশ অস্ত্র ও বিমান কিনতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে।
সম্প্রতি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রসাটম বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শেষ করেছে এবং ২০২৫ সালে দক্ষিণ ইরানে আরো চারটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই করেছে। বর্তমানে রাশিয়ার জ্বালানি কোম্পানিগুলো ইরানের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৬ শতাংশ উত্তোলন করে এবং মস্কো ভারত মহাসাগরে রুশ তেল পরিবহনের জন্য একটি উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর তৈরি করছে। ২০২৩ সালে পুতিনের লবিংয়ের কারণে ইরান ব্রিকস প্লাস+ জোটে যোগ দেয়। ২০১৫ সালে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারকে রক্ষায় দুই দেশ একসাথে কাজ করেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর সাথে চীন যুক্ত হয়ে একটি আমেরিকাবিরোধী অক্ষ তৈরি করেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও সামরিক সহযোগিতা
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ওয়াশিংটনের ‘মাফিয়া শাসনকে’ দায়ী করে রাশিয়ার বয়ানকে সমর্থন করেন এবং ইরান রাশিয়াকে ‘শাহেদ’-২ ড্রোন, গোলাবারুদ ও হেলমেট সরবরাহ করে সামরিক সহযোগিতা দেয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি হামলা শুরু হওয়ার পর রাশিয়াও পাল্টা সহযোগিতা হিসেবে ‘কোমেটা-বি’ স্যাটেলাইট নেভিগেশন মডিউলসহ পরিবর্তিত শাহেদ ড্রোন ইরানে ফেরত পাঠায়। এছাড়া লিয়ানা নামক রুশ স্পাই স্যাটেলাইট সিস্টেমের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য তেহরানকে সরবরাহ করে মস্কো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলায় খামেনির মৃত্যুর তীব্র নিন্দাও জানায় রাশিয়া।
ইউক্রেনের বিনিময়ে ইরানকে ত্যাগের গুঞ্জন
ইরান সংকটে পুতিনের সরাসরি সৈন্য না পাঠানোর সিদ্ধান্ত তার ভাবমূর্তিতে আঘাত হেনেছে বলে মনে করেন নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের সহযোগী ফেলো রুসলান সুলেমানভ।
কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বড় কোনো সুবিধা বা ছাড় (যেমন ডনবাস অঞ্চল ছেড়ে দেওয়া) পেলে ক্রেমলিন সানন্দে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ বা ‘অদলবদল’ করতে রাজি হতো।
সাবেক রুশ কূটনীতিক বরিস বন্ডারেভ এবং ইরান-রাশিয়া সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নিকিতা স্মাগিনের মতে, ইউক্রেনের বিনিময়ে ইরানকে বাজি ধরা ক্রেমলিনের স্বার্থের অনুকূলেই ছিল। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আপত্তির কারণে ওই সময় এখন পার হয়ে গেছে। এখন রাশিয়া বড়জোর ওয়াশিংটনকে এই প্রস্তাব দিতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে স্যাটেলাইট তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবে রাশিয়াও ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করবে।
মধ্যস্থতায় রাশিয়ার অনুপস্থিতি
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান শান্তি আলোচনা মধ্যস্থতার জন্য রাশিয়ার পরিবর্তে পাকিস্তানকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বাকুর ‘মিনভাল পলিতিকা’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক এমিল মুস্তাফায়েভের মতে, এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক রাজনীতিতে মস্কো ও তার ইরান জোটের গুরুত্বহীনতাকেই ফুটিয়ে তোলে। তাছাড়া মধ্যস্থতার জন্য যে ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ প্রয়োজন, ১৯৯৪ সালের বুদাপেস্ট চুক্তির বরখেলাপ করে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করার পর রাশিয়ার সেই বিশ্বস্ততা আর অবশিষ্ট নেই।
সূত্র: আলজাজিরা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


