গত ২৯ আগস্ট রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনে (রাওয়া) আয়োজিত এক সেমিনারে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জাতীয় ঐক্য : সংলাপ ও সহযোগিতা’। সেখানে আমি সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের ‘পদত্যাগের নৈতিক সংস্কৃতি’র ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছিলাম। কিন্তু সেমিনারের সেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুধু মিলনায়তনের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ না রেখে, দেশের আপামর জনসাধারণ, নীতিনির্ধারক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্মকর্তাদের সচেতনতার বৃহত্তর স্বার্থেই এই নিবন্ধের অবতারণা। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতা ওল্টালে একটি নির্মম সত্য বারবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে, রাজনীতিবিদদের প্রচলিত প্রক্রিয়ায় জাতীয় স্বার্থের অভিন্ন বিন্দুতে ঐক্যবদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব। ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথের স্যার নিনিয়ান স্টিফেন থেকে শুরু করে ২০১৩ সালে জাতিসংঘের ফার্নান্দেজ তারানকো, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার বহু চেষ্টা রাজনীতিকদের চরম অনাস্থা আর অনমনীয়তায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সংলাপের উদ্যোগগুলোও ডুবেছে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থপরতার চোরাবালিতে। এই তিক্ত বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যখন রাজনীতির মঞ্চ ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রকে চরম ধ্বংস আর রক্তপাত থেকে বাঁচাতে প্রয়োজন হয় প্রথাভাঙা, আপসহীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ।
বাঙালি জাতির ইতিহাস যেমন বীরত্বের, তেমনই আত্মঘাতী এক চক্রে বন্দি। চরম সংকটকালে রাজপথে রক্ত দিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রাম কিংবা ২০২৪ সালের রক্তস্নাত আগস্ট বিপ্লব তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, রাজপথের লাশ আর বিপ্লবের বারুদ শান্ত হতে না হতেই দেশ গড়ার শপথ পেছনে ফেলে শুরু হয় ক্ষমতার নির্লজ্জ ভাগবাটোয়ারা। স্বৈরাচার আর ফ্যাসিবাদের বিষদাঁত ভাঙতে কেন প্রতি প্রজন্মে তরুণদের বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হতে হবে? রাজনীতিকদের যেখানে সহজে এক টেবিলে বসানো যায় না, সেখানে স্বৈরাচার রুখতে এবং রক্তপাত বন্ধ করতে সবচেয়ে কার্যকর ও মানবিক পথ হলো শীর্ষ সামরিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের ‘পদত্যাগের নৈতিক সংস্কৃতি’। রাষ্ট্রীয় ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এক পরম সাশ্রয়ী এবং রক্তপাতহীন প্রতিরোধ। রাজনৈতিক প্রভুদের কোনো অসাংবিধানিক ও বেআইনি নির্দেশের মুখে দাসত্ব না করে বাহিনী প্রধানরা যদি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পদত্যাগের মতো চূড়ান্ত নৈতিক অবস্থান নেন, তবে স্বৈরাচারের তাসের ঘর এক মুহূর্তেই ধসে পড়তে বাধ্য। রাজপথে একটি তাজা প্রাণ ঝরার আগেই থেমে যাবে রক্তবন্যা।
সদ্য বাংলাদেশ অতিক্রম করেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রক্তস্নাত দ্বিতীয় স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। এ ঘটনাবহুল দিনগুলো জাতির স্মৃতিতে স্বৈরাচারের বর্বরতা ও আত্মত্যাগের গভীর ক্ষতকে আবার তাজা করে দেয়। কিন্তু বাঙালির আত্মঘাতী রাজনৈতিক চরিত্র এবং সীমান্তপাড়ের আধিপত্যবাদী ভূরাজনৈতিক কূটচালের কারণে রাজনীতিকদের একই ছাতার নিচে আনা যেখানে প্রায় অসম্ভব, সেখানে সার্বভৌমত্ব রক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল আমাদের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক থেকে শুরু করে ১৯৪৭-পরবর্তী পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের হীনমন্যতায় ভোগাতে ধূর্ততার সঙ্গে ‘নন-মার্শাল রেস’ বা ‘অযুদ্ধংদেহী জাতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। তবু, আমাদের ধমনির লড়াকু রক্তকে কখনো মুছে ফেলা যায়নি। আকাশ কাঁপানো ১৯৬৫-এর অকুতোভয় বাঙালি বৈমানিক এবং সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব পেয়ে ‘ডিফেন্ডার অব লাহোর’খ্যাত অপরাজেয় প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেই মিথ্যা মিথ ভেঙে চুরমার করেছে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে লাহোরের রণাঙ্গনে বুক চিতিয়ে ভারতীয় বাহিনীকে রুখে দিয়ে নিজেদের শৌর্যবীর্যের যে বীজ তারা বপন করেছিল, সেই অদম্য প্রতিরোধই পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। যে লড়াকু রক্ত এ দেশের সামরিক বাহিনীর ধমনিতে প্রবাহিত, সেই দেশপ্রেমিক শক্তির আপসহীন নৈতিক অবস্থানই পারে যেকোনো আধিপত্যবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে অপরাজেয় ঢাল হিসেবে রক্ষা করতে।
আমাদের আঞ্চলিক বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারত বা পাকিস্তানের সরকারগুলো সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও চেইন অব কমান্ডে নগ্ন হস্তক্ষেপ থেকে অনেকটাই বিরত থেকেছে। অথচ ২০০৯ সালের বিডিআর ট্র্যাজেডির দিন থেকেই আমাদের সেনাবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয় এবং এরপর যেন তাদের দীর্ঘ এক নির্বাসিত ছুটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ২০২৪ সালের আগস্টে সেই সেনাবাহিনী জনগণের আকাঙ্ক্ষার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল বলেই ফ্যাসিবাদের পতন সম্ভব হয়েছিল। তবে গত দেড় দশকে রাজনৈতিক স্বার্থে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা দেশের ইতিহাসে এক অন্ধকারতম অধ্যায়। রাজনৈতিক প্রভুদের তুষ্ট করতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বলপ্রয়োগজনিত গুম। রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিণতি আজ কতখানি করুণ ও লজ্জাজনক, তা স্পষ্ট। কতিপয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অন্ধ আজ্ঞাবহতার কারণে আজ বহু জুনিয়র অফিসারকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে, আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, এমনকি অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি। পতিত স্বৈরাচারের সহযোগী একাধিক জেনারেল আজ পালিয়ে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, যা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এক চরম জাতীয় লজ্জা। একই সঙ্গে সাবেক দুই সেনাপ্রধান আজ আত্মগোপনে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মুখোমুখি হওয়ার মতো চরম অপমানের মুখে পড়েছেন।
এই ঐতিহাসিক সংকট থেকে স্থায়ী উত্তরণ ও কার্যকর জাতীয় ঐক্য গঠনে এটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিমত ও দুটি মৌলিক প্রস্তাবনা।
প্রথম প্রস্তাবনা হলো, পদত্যাগের নৈতিক সংস্কৃতি ও আপসহীন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কারণে কোনো বেআইনি বা মানবাধিকারবিরোধী আদেশ দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। যদি কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এমন অবৈধ নির্দেশ চাপিয়ে দেন, তবে জুনিয়র কর্মকর্তাদেরও সেই বেআইনি আদেশ তামিল করতে অস্বীকার করতে হবে এবং পদত্যাগের হুমকি দিয়ে নৈতিক অবস্থান নিতে হবে। অনেকে ভাবতে পারেন, পদত্যাগ করলে সামরিক ক্যারিয়ার বা পদমর্যাদা চিরতরে হারিয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাসের আদালত সবসময় ন্যায়বিচার করে। ভারতের সামরিক ইতিহাস এর সবচেয়ে বড় নজির। দেশটির প্রথম কমান্ডার-ইন-চিফ ফিল্ড মার্শাল কে এম কারিয়াপ্পা ১৯৪৯ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে দাঁড়িয়েও পদত্যাগের অনড় অবস্থান নিয়ে সেনাবাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখেছিলেন। এই আপসহীন নীতিবোধের কারণে অবসরের ৩৩ বছর পর, ১৯৮৬ সালে ৮৭ বছর বয়সে তাকে ভারতের সর্বোচ্চ পাঁচ-তারকা ফিল্ড মার্শাল পদমর্যাদায় ভূষিত করে তার অবদানকে চিরন্তন স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একইভাবে ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ ১৯৭১ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর তাৎক্ষণিক যুদ্ধ ঘোষণার চাপের মুখে পেশাদার সামরিক যুক্তি তুলে ধরে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই আপসহীন অবস্থানের ফলেই পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি সম্ভব হয়েছিল এবং ডিসেম্বরে অর্জিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বিজয়, যার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৩ সালে তিনি ভূষিত হন দেশটির প্রথম ফিল্ড মার্শাল পদে।
পদত্যাগের নৈতিক শক্তি শুধু বিদেশের উদাহরণেই সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের নিজেদের ইতিহাসেও রয়েছে এর উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে শূন্য হাতে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রসদ ও ভূখণ্ড ছাড়া এক গেরিলা বাহিনীকে সুসংগঠিত করে যিনি স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছিলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী। জেনারেল ওসমানী শুধু রণক্ষেত্রের বীর সেনাপতিই ছিলেন না, ক্ষমতার মোহ উপেক্ষা করে নীতিতে অবিচল থাকার এক অনন্য প্রতীক ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বেসামরিক নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক পথচ্যুতি এবং ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রতিবাদে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সংসদ সদস্য পদ ও ক্ষমতাসীন দল থেকে পদত্যাগের মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও নীতির প্রশ্নে আপস না করে পদত্যাগের এমন মেরুদণ্ডসম্পন্ন দৃষ্টান্ত আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।
দ্বিতীয় প্রস্তাবনা হলো, পরবর্তী প্রজন্মের আপসহীন ও আত্মমর্যাদাশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলা। অতীতে চেইন অব কমান্ড ভেঙে কতিপয় উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তা রাজনৈতিক পদলেহন করেছেন, ক্ষমতার মসনদ বাঁচাতে সহকর্মীদের বিপদে ফেলেছেন এবং দিনশেষে কলঙ্কিত হয়ে পালিয়েছেন। ২০২৪ সালের বিপ্লবোত্তর নতুন বাংলাদেশে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীতে আর কোনো মীরজাফর বা আত্মমর্যাদাহীন কদমবুসি চাটুকারের ঠাঁই হতে পারে না।
আমাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে হতে হবে বঙ্গবীর ওসমানীর যোগ্য উত্তরসূরি, অর্থাৎ দৃঢ়চেতা, অটল ও আত্মমর্যাদাশীল। ভবিষ্যতে দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে যদি কোনো বাহিনীপ্রধান বা শীর্ষ কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভুদের বেআইনি ও জনবিরোধী আদেশের দাসত্ব না করে জাতীয় স্বার্থে মাথা উঁচু করে পদত্যাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন, তার সেই অদম্য নৈতিক সাহস ও দেশপ্রেমের প্রতি সমগ্র কৃতজ্ঞ জাতি জানাবে উষ্ণ ‘অগ্রিম স্যালুট’ এবং ইতিহাস তাকে ভূষিত করবে জাতীয় বীরের চিরন্তন সম্মানে। রক্ত, দাসত্ব ও কলঙ্কের শৃঙ্খল ভেঙে শীর্ষ থেকে অধস্তন পর্যন্ত এই আপসহীন সেনাপতিত্বই গড়ে তুলবে এক চির-নিরাপদ, সার্বভৌম ও অপরাজেয় বাংলাদেশ।
লেখক: সাবেক সহকারী নৌবাহিনীপ্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


