সৌদিতে হুথির হামলা, পরীক্ষায় মক্কা চুক্তি

সৌদিতে হুথির হামলা, পরীক্ষায় মক্কা চুক্তি
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনের হুথিদের হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা কাঠামোকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। মোখা বন্দর দখলের পর বাব আল-মান্দাব প্রণালির প্রধান নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা। সৌদি আরবের কয়েকটি শহরেও হামলা চালিয়েছে হুথিরা। এতে নারী ও শিশুসহ প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, এবার কি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হবে?

বিজ্ঞাপন

সৌদি আরবের জ্বালানি, বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার পাশাপাশি ইরান ও হুথিদের সামুদ্রিক অবরোধ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব আক্রান্ত হলে চুক্তির আওতায় পাকিস্তান ও তুরস্ক কী ধরনের সহায়তা দেবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

চুক্তির পেছনে রয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভূমিকার পরিবর্তন। অঞ্চলটির প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছুদিন ধরে বলে আসছে, নিজেদের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধের বড় দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোকেই নিতে হবে। মার্কিন সহায়তা থাকবে, তবে তা সীমিত হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সেই অবস্থানের বাস্তব প্রভাবও দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক মিত্রদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা দিতে পারেনি। এমনকি উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের ঘাঁটিতেও কয়েক দফা হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।

এই বাস্তবতায় নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোর দিকে এগোয় উপসাগরীয় দেশগুলো। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান প্রথমবারের মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। চলতি বছরের আগস্টে এতে তুরস্ক যুক্ত হয়। এর নাম দেওয়া হয় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি।

রিয়াদে তিন দেশের যৌথ সচিবালয়ও গঠিত হয়েছে। প্রাথমিক তিন বছরের জন্য এর সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছে পাকিস্তান।

তবে চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে ঠিক কোন পর্যায়ে অন্য সদস্যরা সরাসরি সামরিকভাবে এগিয়ে আসবে, সে বিষয়ে প্রকাশ্য কোনো সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। যুদ্ধের নিয়ম, পরামর্শের প্রক্রিয়া এবং যৌথ প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধের কাঠামোও এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

তারপরও পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে এখন আর খুব বেশি অস্পষ্টতা নেই।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ চলতি সপ্তাহের শুরুতে বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা হলে অথবা ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হবে। এ বিষয়ে ‘কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে চুক্তি কার্যকর হলে পাকিস্তান ঠিক কী করবে, তা বলেননি খাজা আসিফ।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গত মাসে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, মক্কা চুক্তি ন্যাটোর মতো কাজ করবে। অর্থাৎ আক্রান্ত দেশকে সহায়তা চাইতে হবে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেটিও তাকে নির্ধারণ করতে হবে।

ন্যাটোর চতুর্থ অনুচ্ছেদে সদস্যদেশের নিরাপত্তা নিয়ে পরামর্শ ও তথ্য বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে। পঞ্চম অনুচ্ছেদে পারস্পরিক সহায়তার কথা বলা হলেও সহায়তার ধরন নির্ধারণের ক্ষমতা প্রত্যেক দেশের হাতে থাকে।

২০১২ সালে সিরিয়ার গুলিতে তুরস্কের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর আঙ্কারা ন্যাটোর চতুর্থ অনুচ্ছেদ কার্যকর করেছিল। তুরস্ক সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ চায়নি। তারা চেয়েছিল প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ন্যাটো সেই অনুরোধ অনুমোদন করে এবং তুরস্কের আকাশসীমা সুরক্ষায় ব্যবস্থা মোতায়েন করে।

মক্কা চুক্তিতেও এমন পথই অনুসরণ করা হতে পারে। অর্থাৎ সৌদি আরবকেই বলতে হবে, তাদের কী সহায়তা প্রয়োজন। রিয়াদ যদি অস্ত্র বা গোয়েন্দা সহায়তার বাইরে পাকিস্তানের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ চায়, ইসলামাবাদের ওপর তা বিবেচনার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। তবে সহায়তার ধরন ও পরিসর নিয়ে সদস্যদেশগুলোর পরামর্শ প্রয়োজন হবে।

এখন পর্যন্ত সেই পরীক্ষা আসেনি। সৌদি আরব পাকিস্তান বা তুরস্ক—কাউকেই চুক্তি কার্যকরের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়নি।

বরং আপাতত কূটনীতিতেই জোর দিচ্ছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেছেন।

পাকিস্তান প্রকাশ্যেই ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানিয়েছে। সৌদি আরবে হামলা এবং বাব আল-মান্দাবের জন্য হুমকি তৈরি না করতেও তেহরানকে সতর্ক করেছে ইসলামাবাদ। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় নিজেদের অঙ্গীকারের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

কূটনীতি ব্যর্থ হলে পরবর্তী ধাপে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সহায়তা বাড়তে পারে। সৌদি আরবে পাকিস্তানের প্রায় ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কয়েক হাজার সেনা আগে থেকেই মোতায়েন রয়েছে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহায়তা বাড়ানোর সুযোগ তাদের রয়েছে।

তবে ইয়েমেনের ভেতরে পাকিস্তানি সেনাদের সরাসরি অভিযান চালানোর সম্ভাবনা আপাতত কম।

এর পেছনে বড় কারণ পাকিস্তানের নিজের অভিজ্ঞতা। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে সোভিয়েতবিরোধী আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কথা ইসলামাবাদ ভুলে যায়নি। ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধে জড়ালে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় বড় চাপ পড়তে পারে।

দেশের ভেতরেও হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা বা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হবে।

তাই সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হলো—ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা আরো শক্ত করা এবং বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তায় বহুজাতিক নৌজোট গঠনের চেষ্টা করা। সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও এতে মক্কা চুক্তির মূল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে।

তবে এই নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এখনো শুরুর পর্যায়ে। যৌথ প্রতিক্রিয়ার নিয়ম ও প্রক্রিয়া পুরোপুরি তৈরি হতে সময় লাগবে। তত দিন সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্কই সবচেয়ে কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।

এ্ম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন