ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের আকাশ

ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের আকাশ

সপ্তাহজুড়ে ভয়াবহ দাবানলের সঙ্গে লড়াই করছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির এই দাবানলের কারণে সৃষ্টি হওয়া বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের দেশ মালয়েশিয়া এবং ফিলিপাইনের বিভিন্ন অঞ্চলেও। দাবানল থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া কুয়াশার চাদরের মতো ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঢেকে রেখেছে। ঘন কুয়াশার কারণে ব্যাহত হচ্ছে আগুন নেভানোর কাজও।

সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপের ইন্দোনেশিয়ান অংশ কালিমেন্টানের কয়েক লক্ষ মানুষ এই বিষাক্ত কুয়াশার কারণে এরই মধ্যে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছে যে, অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর ক্লাউড-সিডিং অথবা বিমানের মাধ্যমে আগুন নেভানোর অপারেশন চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিশাল এলাকাজুড়ে বিষাক্ত কুয়াশার সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই দাবানলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। কালিমেন্টানের লক্ষ লক্ষ মানুষ এই ক্ষতিকর বায়ুর সংস্পর্শে এসেছে। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলেও জানা গেছে।

নতুন করে আগুন লাগা রোধ করতে এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় কয়েক হাজার কর্মকর্তা মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার শুষ্ক মৌসুমে কৃষকেরা পাম অয়েল চাষ এবং পাল্প ও কাগজ উৎপাদনের জন্য জমি পরিষ্কার করতে প্রায়শই আগুনের সাহায্য নেন। তবে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে এই আগুন অনেক সময় অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যার মধ্যে কালিমেন্ট ও সুমাত্রার সুরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

ইন্দোনেশিয়ায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে জমি পরিষ্কার করা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এই পদ্ধতি অব্যাহত রয়েছে। এল নিনো শুষ্ক মৌসুমে এই দাবানল বিশেষভাবে তীব্র আকার ধারণ করে এবং চলতি বছরে একটি সুপার এল নিনো এই বিপর্যয়কে আরও মারাত্মক করে তুলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া সরকার স্বীকার করেছে যে, এই আগুন মূলত ব্যক্তি বা কর্পোরেশন দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবেই লাগানো হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রবোবো সুবিয়ান্তো সম্প্রতি বলেছেন যে, তিনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।

এদিকে, ইন্দোনেশিয়ায় যখন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের কারণে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তখন যে সমস্ত প্রতিবেশী দেশে কুয়াশা দেখা গেছে, সেখানেও স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের অংশ সারাওয়াকে, বেশ কিছু এলাকায় এয়ার পলুশন ইনডেক্স (আইপিআই) ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে রয়েছে। কুচিং, সামারাহান, সেরিয়ান, শ্রী আমান ও বেতোং কর্তৃপক্ষ সরাসরি বা সামনাসামনি ক্লাস স্থগিত করেছে, কারণ কালিমেন্টান থেকে আসা ধোঁয়া দিনে দিনে আরও ঘন হয়ে উঠছে। সারাওয়াকের বাসিন্দা মুহাম্মদ ফাজলি বেন্দাউদ জানিয়েছেন যে তিনি চিন্তিত, কারণ কুয়াশা ‘দিনে দিনে আরও তীব্র হচ্ছে।’

ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল অব্যাহত থাকায় বায়ুদূষণের দিকে নজর রাখার কথা জানিয়েছে প্রতিবেশী দেশ সিঙ্গাপুরও। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ওই অঞ্চলে ২০১৩ এবং ২০১৫ সালের ভয়াবহ দাবানলের কথাও স্মরণ করছেন অনেকে। যখন পুরো শহরটি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে ধোঁয়ার কুয়াশায় ঢাকা ছিল। সে সময় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছিল, ফাস্ট ফুড চেইনগুলো হোম ডেলিভারি বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে এন-৯৫ মাস্কের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।

গত কয়েক বছর ধরে সিঙ্গাপুর েই কুয়াশা এড়িয়ে চলতে পেরেছিল, কারণ ইন্দোনেশিয়া তাদের বার্ষিক দাবানলের মাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এনেছিল। কিন্তু চলতি বছর ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতিকে আরও মারাত্মক করে তুলতে পারে এমন সতর্কবার্তায় সিঙ্গাপুর আবারও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। সরকার ও খুচরা বিক্রেতারা পর্যাপ্ত এন-৯৫ মাস্ক মজুত করেছে এবং স্কুলগুলো বাইরের কার্যক্রম কমিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

এমনকি অক্টোবরের শুরুর দিকে লক্ষাধিক মানুষের সমাগমে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফর্মুলা ওয়ান গ্র্যান্ড প্রিক্সের জন্যও একটি আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে মাস্ক মজুত করা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা প্রস্তুত রাখার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।

এদিকে, ফিলিপাইনের দ্বীপ প্রদেশ পালাওয়ানের চিকিৎসক ডা. প্রেশিয়াস বানাস-মেলাড জানিয়েছেন যে, গত কয়েক দিনে তার স্বামী এবং ফুফাতো ভাইয়ের চোখ, নাক ও গলায় চুলকানি অনুভূত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন হালকা মাথাব্যথারও মুখোমুখি হচ্ছি। আমার ফুফাতো ভাই, যার কোনো কিছুতেই এলার্জি নেই, তার এলার্জি দেখা দিতে শুরু করেছে। আমার স্বামীই প্রথম ব্যক্তি, যার চোখ ও গলায় চুলকানি শুরু হয়েছিল’

গত সপ্তাহে তিনি বালাবাক শহরের আকাশে কুয়াশা লক্ষ করেছিলেন, কিন্তু মঙ্গলবারে মনে হচ্ছিল ‘যেন কুয়াশা এখন আমাদের ঠিক সামনেই এসে উপস্থিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রবিবার একটি পোড়া গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। পোড়া গন্ধটি আমাদের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে আসছে ভেবে আমরা আমাদের টেলিভিশন, কফি মেকার এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে ফেলেছিলাম। কিন্তু ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে দেখলাম যে এটি মূলত ইন্দোনেশিয়ার বনের আগুনের গন্ধ।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন