চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিক মৃত্যুর পর পুরো ইয়ার্ডের কার্যক্রম বন্ধ রাখায় জাহাজ ভাঙা শিল্পে নতুন করে চরম সংকট তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনার পর তদন্তের দোহাই দিয়ে সমগ্র ইয়ার্ডের সার্বিক কাজকর্ম অচল করে দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এ খাতের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা।
মালিকপক্ষের দাবি, দুর্ঘটনার পর সরকারি বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা মৌখিকভাবে পুরো ইয়ার্ডের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তবে লিখিতভাবে কে বা কোন দপ্তর থেকে এ নির্দেশ জারি করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এস এম শফিউল আলম তালুকদারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ইয়ার্ডের পুরো কার্যক্রম হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় বহুমুখী আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান: সনদ ও ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি: ইয়ার্ডে থাকা অন্য নিরাপদ জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রদত্ত ছাড়পত্রের মেয়াদ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। কাজ বন্ধ থাকলেও মেয়াদ বাড়ানো সহজ নয়।
বিপুল আর্থিক লোকসান ও ব্যাংকিং চাপ: কারখানা বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসে বসে বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর ওপর প্রতিদিন ব্যাংকঋণের সুদ যুক্ত হওয়ায় মালিকপক্ষ মারাত্মক আর্থিক চাপে পড়েছেন। পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে অনেক কর্মকর্তা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, যে জাহাজে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটির কার্যক্রম বন্ধ রেখে তদন্ত চলুক—এতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু ইয়ার্ডের অন্য জাহাজগুলোতে কাজ বন্ধ রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। পুরো ইয়ার্ড বন্ধ রেখে দেশের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল সরবরাহকারী একটি শিল্পকে অচল করে দেওয়া ঠিক নয়।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিনের সরকারি নানামুখী জটিলতায় সীতাকুণ্ডে চালু থাকা ১২৪টি ইয়ার্ড কমে এখন ৩৫-৩৮টিতে নেমে এসেছে। শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি, তবে তদন্তের নামে নিরাপদ অংশের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হলে উদ্যোক্তারা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং দেশে ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল সংকট চরম আকার ধারণ করবে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, একসময় সীতাকুণ্ড উপকূলজুড়ে ১২৪টিরও বেশি শিপব্রেকিং ইয়ার্ড পুরোদমে চালু ছিল। কিন্তু ক্রমাগত লোকসান, ব্যাংকঋণের দায় এবং সরকারি নজরদারির নামে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে একে একে বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সক্রিয় ইয়ার্ডের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫ থেকে ৩৮টিতে। ফলে অনেক উদ্যোক্তাই দেউলিয়া ও ঋণখেলাপি হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
মালিকপক্ষের দাবি, ইয়ার্ডে অবস্থানরত অন্য দুটি জাহাজের পরিবেশ, বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। ইয়ার্ড বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে, একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের সুদও প্রতিদিন বাড়ছে। ফলে মালিকপক্ষ বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

