মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়গুলোর একটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব পুরো বিশ্বেই পড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যেও কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ রয়েছে। কূটনৈতিক উপায়ে উপসাগরীয় সংকট সমাধান করা সম্ভব এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল পুনরায় চালু করে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। ইরানসহ পুরো অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এই সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এসব মন্তব্য করেন ।
ইরান ঘিরে চলমান যুদ্ধ, প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে কাতারের আমির বলেন, বছরের পর বছর সংকট ব্যবস্থাপনা পিছিয়ে দেওয়া এবং অস্থায়ী ও অবাস্তব নীতির কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিরোধ নিষ্পত্তির পথ হওয়া উচিত সংলাপ ও আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকারের প্রতি সম্মান।
শেখ তামিম মধ্যপ্রাচ্যে একটি আঞ্চলিক ‘সম্মিলিত নিরাপত্তা’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান থাকতে হবে। বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিও এর অংশ হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, এমন নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে একটি পক্ষ তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে, যে যুদ্ধ তাদের নিজেদের নয়। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও স্থাপনায় হামলা হতে পারে এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব তুলে ধরে কাতারের আমির বলেন, বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জ্বালানি বাণিজ্য যে আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে পরিচালিত হয়, সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো চাপ ও দর-কষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠলে এর মূল্য দিতে হয় বিশ্বের সাধারণ মানুষকে। এর প্রভাব খাদ্য ও ওষুধের দাম এবং মানুষের জীবিকার ওপরও পড়ে।
গাজা পরিস্থিতিকেও তার বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব দেন কাতারের আমির। তিনি বলেন, ফিলিস্তিন প্রশ্নকে উপেক্ষা করে ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলা যায় না। গাজায় যা ঘটেছে, তাকে তিনি ‘সব অর্থেই গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, এই বিপর্যয় ঠেকাতে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার মাত্রা ও বিপর্যয়ের ব্যাপকতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
শেখ তামিম অভিযোগ করেন, গাজার জনগণকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়াকে সমাধান হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি ইসরাইলের প্রতি গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধ করা, সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার, অবরোধ প্রত্যাহার এবং শর্তহীনভাবে মানবিক সহায়তা প্রবেশের আহ্বান জানান।
পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার বক্তব্যে ইসরায়েলি দখলদারত্ব, বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার হরণের অভিযোগ উঠে আসে। তিনি পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারকে ফিলিস্তিনি জনগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। আল-আকসা মসজিদসহ ইসলামি ও খ্রিস্টান পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা রক্ষার কথাও বলেন তিনি।
সিরিয়া ও লেবাননে ইসরাইলের কর্মকাণ্ড নিয়েও মন্তব্য করেন কাতারের আমির। তার অভিযোগ, ইসরাইল প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। সিরিয়ায় ইসরাইলি হামলা এবং ১৯৬৭ সাল থেকে গোলান মালভূমির নিয়ন্ত্রণে থাকার বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন। লেবাননের ক্ষেত্রেও ইসরাইলি সেনাদের উপস্থিতি ও দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলো ধ্বংসের অভিযোগ তোলেন তিনি।
আঞ্চলিক অন্যান্য সংকটের প্রসঙ্গে শেখ তামিম মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার কয়েকটি দেশে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবসানের আহ্বান জানান। সিরিয়া ও লিবিয়ার পুনর্গঠন ও জাতীয় পুনর্মিলনের প্রচেষ্টায় কাতারের সমর্থনের কথাও তিনি জানান।
সুদানে টেকসই শান্তির জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের আহ্বান জানিয়ে তিনি সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কাতারের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। ইয়েমেন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষেও অবস্থান জানান তিনি।
ভাষণের শেষ দিকে শেখ তামিম বলেন, কাতারের মূল্যবোধ শুধু উচ্চারিত স্লোগান নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে জাতির মর্যাদা কোনোভাবেই আপস না করার বিশ্বাস। তার ভাষায়, প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

