আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইসরাইলি দখলদারদের সহিংসতায় পশ্চিম তীরে বাস্তুচ্যুত বেদুইনরা

আমার দেশ অনলাইন

ইসরাইলি দখলদারদের সহিংসতায় পশ্চিম তীরে বাস্তুচ্যুত বেদুইনরা

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের একটি গ্রামে বসবাসকারী বেদুইনরা গভীর হতাশা ও কষ্ট নিয়ে নিজেদের ভেড়ার খোঁয়াড় ভেঙে ফেলছেন, মালপত্র ট্রাকে তুলছেন এবং এলাকা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইসরাইলি দখলকৃত এই ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মুখে তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিম তীরজুড়ে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আধা-যাযাবর বেদুইন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের অভিযোগ, কার্যকর আইন-শৃঙ্খলার অভাবে তারা কার্যত জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শিকার হচ্ছেন। বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

রাস আইন আল-আউজা গ্রামের বাসিন্দা বেদুইন ফারহান জাহালিন বলেন, গত দুই বছর ধরে দিনরাত বসতি স্থাপনকারীদের ধারাবাহিক হামলায় তাদের পুরো সম্প্রদায় ভেঙে পড়েছে। তার ভাষায়, “এই অবিরাম চাপের ফলে আমাদের গ্রামে আর টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।”

১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর দখলের পর থেকে সেখানে ইসরাইলি বসতি ক্রমেই সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে এই এলাকায় পাঁচ লাখের বেশি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে, বিপরীতে ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। স্থানীয়দের অভিযোগ, অল্পসংখ্যক বসতি স্থাপনকারী সহিংসতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, গত বছরের অক্টোবরে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার সংখ্যা রেকর্ড ২৬০টিতে পৌঁছায়, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরেই জাহালিনের সম্প্রদায় বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কায় ছিল, তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই চাপ আরও বেড়েছে। গ্রামের ১৩০টি পরিবারের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ইতোমধ্যেই অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জাহালিন জানান, স্থানীয় কা’বনেহ গোত্রের অন্তত ২০টি পরিবার গত সপ্তাহে গ্রাম ছেড়েছে এবং আরও প্রায় ৫০টি পরিবার ঘরবাড়ি খুলে ফেলছে। গ্রামের আশপাশে বসতি স্থাপনকারীদের ট্রেলার বসানো হয়েছে, যা ধীরে ধীরে স্থায়ী ঘরে রূপ নিচ্ছে—কিছু আবার বেদুইনদের বসতবাড়ি থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে।

গত বছরের মে মাসে বসতি স্থাপনকারীরা গ্রামের প্রধান পানির উৎস ঝর্ণা থেকে পানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে। ওই ঝর্ণাটিই দীর্ঘদিন ধরে বেদুইন সম্প্রদায়ের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন ছিল। বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগ ও সেচ পাইপ কেটে দেওয়া এবং নিজেদের পশু বেদুইনদের ঘরের কাছাকাছি চরানোর মাধ্যমে তারা ভয় ও চাপ সৃষ্টি করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নাইফ জায়েদ বলেন, “আমরা যদি নিজেদের ঘর রক্ষা করতে যাই, তাহলে পুলিশ বা সেনাবাহিনী এসে আমাদের গ্রেপ্তার করে। আমাদের কিছু করার নেই।” তিনি আরও জানান, মানুষ কোথায় যাবে সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট পথ পাচ্ছে না।

অধিকাংশ ফিলিস্তিনি বেদুইন পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বসতি স্থাপনকারীরা নিজেদের পশু চরাতে এলে জমি ও খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং সহিংসতার আশঙ্কা তীব্র হয়। বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো এই কৌশলকে ‘পাস্টোরাল কলোনিয়ালিজম’ বা পশুপালনভিত্তিক উপনিবেশবাদ বলে উল্লেখ করছে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা রাস আল-আইন এলাকায় সংঘটিত ঘটনাগুলোর বিষয়ে অবগত এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার পর এলাকায় সেনা উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানানো হয়।

তবে বেদুইনদের আশঙ্কা, এক এলাকা ছেড়ে অন্য গ্রামীণ অঞ্চলে গেলেও ভবিষ্যতে আবারও বাস্তুচ্যুত হতে হবে। জাহালিন বলেন, পাশের জিফতলিক গ্রামের কিছু পরিবার একাধিকবার স্থানচ্যুত হওয়ার উদাহরণ তাদের সামনে রয়েছে।

পশ্চিম তীরের সড়কগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে আরবিতে লেখা স্লোগান দেখা যাচ্ছে—“ফিলিস্তিনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই।” ১৯৯১ সাল থেকে রাস আইন আল-আউজায় বসবাসকারী জাহালিনের মতে, এই বাক্যই তাদের বর্তমান বাস্তবতাকে সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে।

তিনি বলেন, “বসতি স্থাপনকারীরা বেদুইন জীবনধারা ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের সংস্কৃতি ও পরিচয় মুছে ফেলার সব ধরনের চেষ্টা চলছে।”

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন