ঠাকুরগাঁওয়ে এবার হত্যা মামলার আসামি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে জামিন দিয়েছে আদালত। তাদের জামিন হওয়ার খবরে শহরজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
জামিনপ্রাপ্তরা হলেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অরুণাংশু দত্ত টিটো এবং ঠাকুরগাঁও জেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল মজিদ আপেল।
গত মঙ্গলবার টিটোকে এবং বুধবার আপেলকে পর্যায়ক্রমে জামিন দেন ঠাকুরগাঁও জেলা ও দায়রা জজ জামাল হোসেন।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে পলাতক ছিলেন এই দুই শীর্ষ নেতা। গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের নামে হত্যাসহ একাধিক মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে অরুণাংশু দত্তের নামে দুটি এবং আব্দুল মজিদের নামে চারটি মামলা রয়েছে। জানা গেছে, সবকটি মামলায়ই জামিন পেয়েছেন তারা।
মামলা সূত্রে ও আদালতের তথ্যমতে, অরুণাংশু দত্ত টিটোর নামে দায়ের করা বিস্ফোরক আইনের দুটি মামলায় ইতঃপূর্বে চার সপ্তাহের জামিন দেয় আদালত। গত মঙ্গলবার ঠাকুরগাঁও জেলা জজ আদালত দুটি মামলায়ই তাকে স্থায়ী জামিন দেয়।
অন্যদিকে জেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল মজিদ আপেলের নামে দায়ের হওয়া বিস্ফোরক আইনসহ চারটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল না করা পর্যন্ত জামিন দিয়েছে ঠাকুরগাঁও জেলা জজ আদালত।
এদিকে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন হওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ফ্যাসিবাদবিরোধী নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন সংগঠন।
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও ঠাকুরগাঁও জুলাইযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক আবু রায়হান অপু বলেন, বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ নেতারাই আমাদের ওপর ব্যাপক জুলুম-নির্যাতন, মামলা-হামলা চালিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা থাকা সত্ত্বেও রায়ে জামিন দেওয়া মানে জুলাই শহীদের সঙ্গে বেঈমানির শামিল।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এরা কীভাবে জামিন পায়, এটা সম্ভব হয়েছে কেবল রাজনৈতিক সমঝোতায়। বিএনপি নেতারা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে দলীয়করণের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন করিয়েছেন। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, একদিন এসব নীতিনির্ধারকের বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
জামিনের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আলমগীর হোসেন আমার দেশকে বলেন, এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে বিচারব্যবস্থাকে বিএনপি পূর্ণ দলীয়করণ করে তাদের নির্বাচনের পরিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে। বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নেই। এর মাধ্যমে জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে যে আঁতাত হয়েছিল, বর্তমানে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এবং হত্যা, গুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখব।
এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সহসভাপতি ওবায়দুল্লাহ মাসুদ বলেন, জামিন তো আদালত দেয়। আমি মনে করি, একটি রাজনৈতিক দল রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও হাইকোর্টে জামিন পায় আবার নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়ে যায়।
এ ব্যাপারে আসামিপক্ষের আইনজীবী ইমরান হোসেন জানান, আমাদের মক্কেলরা উচ্চ আদালতে জামিনে আছেন এবং নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ ছিল। সে মোতাবেক নিম্ন আদালতে হাজির হয়ে জামিন চেয়েছি, আদালত তা মঞ্জুর করেছে।
জেলা জজ আদালতের সরকারপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) আব্দুল হালিম বলেন, আসামিদের জামিন দেওয়া না দেওয়া সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সালান্দর এলাকার সরওয়ার্দি খোকন ও আশ্রমপাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী বুলু বলেন, এভাবে একের পর এক আসামি জামিন পাওয়ায় মনে হচ্ছে বিশেষ কারো ইঙ্গিতে এসব হচ্ছে। এটা জুলাইযোদ্ধাদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি।
তারা বলেন, দেশের আইনের প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী স্টাইলে দেশ চালাচ্ছে বিএনপি।
গত দুদিন ধরে হত্যা মামলার আসামি ও ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতার জামিনকে ঘিরে জনমনে ব্যাপক আলোচনা ও তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

