মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার রাবার শিল্পে দুর্দিন নেমে এসেছে। এক সময় রাবার শিল্পকে আঁকড়ে ধরে স্থানীয় ও বিভিন্ন এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছিল অনেকেই। এখন ধীরে ধীরে ওই রাবার শিল্প ধ্বংসের দারপ্রান্তে । রাবার গাছের বয়স বৃদ্ধি, উৎপাদন কমে যাওয়া, মজুরি বৃদ্ধি, বাজার মূল্যের উঠানামা, আধুনিক প্রযুক্তির সংকটসহ নানামুখী কারণে রাবার শিল্প লোকসানের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই শিল্প বেঁচে থাকবে কি না তা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সিলেট বিভাগে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কপোরেশনের অধীনে চারটি সরকারি রাবার বাগানের মধ্যে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নে ভাটেরা রাবার বাগান অবস্থিত। সরকারি রাবার বাগান ছাড়াও চা বাগান পরিচালিত এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ছোট-বড় আরো ১৮টি রাবার বাগান রয়েছে কুলাউড়ায়। ভাটেরা সরকারি রাবার বাগানে ২ হাজার ৮৯৯ একর বন ভূমিজুড়ে রাবার চাষ হচ্ছে। তার মধ্যে অধিকাংশ বন ভূমিতে পুরোনো রাবারের গাছ রয়েছে। ওই পুরোনো গাছগুলো উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
বাগান সূত্রে জানা গেছে, একটি রাবার গাছ সাত বছর থেকে শুরু করে ২৮ বছর পর্যন্ত লেটেক্স উৎপাদন করতে পারে। ২৮ বছর পর এর লেটেক্স উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। ওই বাগানে এক সময় অধিক পরিমাণ রাবার উৎপাদন হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে লোকসানের মুখে পড়েছে। ২৫-২৬ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ২ কোটি টাকা। খরচ হয়েছে ৮ কোটি টাকা। এ বিষয়ে ওয়াকি বহাল সূত্র জানায়, পুরোনো বয়সের ভারে নুয়ে পড়া উৎপাদন ক্ষমতা হারানো রাবারের গাছ কেটে নতুন গাছ লাগানো খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। আধুনিক মেশিনারিজ দিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ, উচ্চ ফলনশীল চারা রোপণ, উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনলে সম্ভাবনাময় রাবার শিল্পের দুর্দিন গুছে যাবে।
এ ব্যাপারে ভাটেরা রাবার বাগানের ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির আমার দেশকে বলেন, ভাটেরা রাবার বাগানে ২৫-২৬ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ২ কোটি টাকা। খরচ হয়েছে ৮ কোটি টাকা। লোকসান হলেও আমরা আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছি।
পুরোনো গাছ কেটে নতুন নতুন রাবার গাছ বন ভূমিতে সৃজন করা হচ্ছে। ৭০ একরজুড়ে নতুন গাছ লাগানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সনাতনী পদ্ধতি বাদ দিয়ে নতুন আঙ্গিকে আধুনিক ধূমঘর তৈরির কাজ হাতে নেওয়া হচ্ছে। এসব সম্পন্ন হলে রাবার শিল্প এগিয়ে যাবে। স্থায়ী এবং অস্থায়ী মিলে ২৫০ শ্রমিক বাগানে কাজ করছে। স্থায়ী শ্রমিকের প্রতি মাসে বেতন ৩০ হাজার টাকা। আর অস্থায়ী শ্রমিকের বেতন প্রায় ১৫ হাজার টাকা। বর্তমানে নতুন পুরাতন গাছ থেকে প্রতিদিন ২ হাজার কেজি রাবারের কষ উৎপাদন হচ্ছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত অর্থাৎ ঠান্ডা আবহাওয়া বিরাজ করলে গাছ থেকে লেটেক্স উৎপাদন দ্বিগুণ হয়ে যায়। আমরা আশাবাদী ধীরে ধীরে নতুন গাছগুলো ছয়-সাত মাস বয়সি হলে রাবারের গাছ থেকে লেটেক্স উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। সিলেট অঞ্চলের বন ভূমির রাবার গাছ থেকে আহরিত লেটেক্স গুণে ও মানে অত্যন্ত ভালো। ওই লেটেক্স থেকে উৎপাদিত রাবার পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলানো কনডম, গাড়ি ও বিমানের চাকা, টিউব তৈরি হয়। শ্রীলঙ্কা ও ভারতে আমাদের রাবার রপ্তানি হয়।
এ ব্যাপারে কুলাউড়ার টিলাগাঁও ইউনিয়নের ব্রিটিশ মালিকানাধীন ডানকানের লংলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, চা বাগানের পাশাপাশি আমাদের বাগানের টিলা ভূমিতে ২৫৫ হেক্টর জায়গা জুড়ে রাবারের চাষ হয়েছে। গাছগুলোর বয়স হয়েছে ঢের। তাই উৎপাদন কম হচ্ছে। রাবার শ্রমিকদের পারিশ্রমিক দিয়ে আমরা লাভের মুখ দেখছি না। বর্তমানে এই শিল্পের দুর্দিন চলছে। এ ব্যাপারে কুলাউড়ার জয়চন্ডী ইউনিয়নের ন্যাশনাল টি কোম্পানির মালিকানাধীন বিজয়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির তালুকদার বলেন, চায়ের পাশাপাশি আমাদের বাগানে ৯৮ হেক্টর টিলা ভূমিতে রাবারের চাষ হচ্ছে। ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ছে। তবে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। ভাটেরা রাবার বাগানের টেপার জামান মিয়া জানান, রাবার শিল্প দিনদিন পিছিয়ে পড়ছে। পুরাতন সব গাছ কেটে ফেলে নতুন গাছ রোপণ করতে হবে। আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা হলোÑসাত থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত একটি গাছ থেকে সঠিক মৌসুমে প্রতিদিন হাফ কেজি রাবারের কষ আহরণ করা যায়। গাছের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যা অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। এছাড়াও রাবার পুড়ানোর জন্য আধুনিক ধূমঘর স্থাপন করতে হবে। আমাদের বাগানের ধূম ঘরের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বন ভূমির অধিকাংশ রাবার গাছের বয়স বেড়ে গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

