ইয়োসি মেকেলবার্গ এর বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ

ইসরাইলের প্রতি অসন্তোষ বাড়ছে জর্ডানে

ইসরাইলের প্রতি অসন্তোষ বাড়ছে জর্ডানে

ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের সামরিক অভিযান, অধিকৃত পশ্চিম তীরে দখলদারত্ব সম্প্রসারণ এবং জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা পরিবর্তনের আশঙ্কায় ইসরাইলের প্রতি জর্ডানের অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। দীর্ঘদিনের শান্তিচুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখলেও ইসরাইলি সরকারের নীতির কারণে দুই দেশের সম্পর্ক আরো অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর সাম্প্রতিক বক্তব্য ইসরাইলি সরকারের নীতি নিয়ে আম্মানের গভীর উদ্বেগের প্রকাশ।

ফিলিস্তিন সংকট দুই দেশের সম্পর্কে চাপ বাড়াচ্ছে

বিজ্ঞাপন

১৯৯৪ সালে ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে জর্ডান। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও দুই দেশ চুক্তিটি বজায় রেখেছে। তবে গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি এবং পশ্চিম তীরে ইসরাইলি দখলদারত্বের বিস্তারে জর্ডানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ বেড়েছে।

জর্ডানের জনসংখ্যার একটি বড় অংশের ফিলিস্তিনি শিকড় রয়েছে। পশ্চিম তীর ও গাজায় তাদের আত্মীয়স্বজন ও পারিবারিক যোগাযোগও রয়েছে। ফলে ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা জর্ডানের জনগণের মধ্যে সরাসরি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।

জর্ডানের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ফিলিস্তিনিদের বিপুলসংখ্যক মানুষকে জর্ডান নদীর পূর্ব দিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। আম্মানের দৃষ্টিতে এমন কোনো উদ্যোগ দেশটির জনমিতিক ভারসাম্য, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হবে।

পশ্চিম তীর কার্যত সংযুক্ত করার শঙ্কা

বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ তার বক্তব্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে প্রচলিত কয়েকটি ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

প্রথমত, পশ্চিম তীর ও গাজাকে আলাদা রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দুর্বল হবে।

দ্বিতীয়ত, ইসরাইলের বর্তমান নেতৃত্ব ভবিষ্যতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা থেকে সরে আসবে—এমন প্রত্যাশার বাস্তব ভিত্তি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বাদশাহর আশঙ্কা, মাটিতে দখলদারত্ব সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই বিরোধিতা স্থায়ী রূপ পাচ্ছে।

তৃতীয়ত, আরব বিশ্ব কখনোই শান্তি চায়নি—এমন ধারণাকেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ২০০২ সালের আরব শান্তি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরাইল যদি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ আঞ্চলিক শান্তির স্বীকৃত শর্তগুলো গ্রহণ করে, তাহলে বৃহত্তর সমঝোতার পথ তৈরি হতে পারে।

এসব সতর্কবার্তা শুধু ইসরাইলের সঙ্গে জর্ডানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

শান্তিচুক্তির স্বার্থ দুই দেশেরই

ইসরাইল ও জর্ডানের মধ্যে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে।

এই সহযোগিতা ইসরাইলকে তার পূর্ব সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে। একই সঙ্গে জর্ডানের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায়ও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অর্থাৎ রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শান্তিচুক্তি দুই দেশের জন্য বাস্তব নিরাপত্তাগত সুবিধা তৈরি করেছে। কিন্তু ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিরোধ বাড়তে থাকলে এই সহযোগিতা বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

পানি সরবরাহ নিয়েও নতুন টানাপোড়েন

জর্ডানের জন্য পানি নিরাপত্তা একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ। দেশটির পানিসংকট মোকাবিলায় ইসরাইলের সঙ্গে পানি সরবরাহসংক্রান্ত চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

২০২১ সালের একটি চুক্তির আওতায় জর্ডানকে বছরে ৫০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সরবরাহ করা হতো। কিন্তু পশ্চিম তীর ও গাজা নিয়ে জর্ডানের সমালোচনার প্রেক্ষাপটে ইসরাইলি সরকার চুক্তিটি নবায়ন করেনি।

পানির মতো মৌলিক মানবিক প্রয়োজনকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে এটি জর্ডানের পানিসংকট আরো বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

জেরুজালেমের পবিত্র স্থান ঘিরে উদ্বেগ

জর্ডানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা জেরুজালেম। শহরটির মুসলিম ও খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোর তত্ত্বাবধানে হাশেমি রাজপরিবারের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। এসব স্থানের বিদ্যমান আইনগত ও ধর্মীয় মর্যাদা বজায় রাখাকে জর্ডান তার গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ হিসেবে বিবেচনা করে।

ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও তার সমর্থকদের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পবিত্র স্থানগুলোর বর্তমান ব্যবস্থায় পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জর্ডানের আশঙ্কা, জেরুজালেমের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর মর্যাদা নিয়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তা শুধু ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে জর্ডানের ঐতিহাসিক তত্ত্বাবধানের ভূমিকা এবং পবিত্র স্থানগুলোর বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার প্রশ্ন দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

পশ্চিম তীরের দায়িত্ব জর্ডানকে দেওয়ার প্রস্তাব

ইসরাইলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও বিরোধী রাজনীতিক আভিগদর লিবারম্যান পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় জর্ডানকে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।

লিবারম্যানের বক্তব্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ‘এ’ ও ‘বি’ এলাকার কথা এসেছে। তবে এই প্রস্তাবকে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার ও নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার আরেকটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কারণ পশ্চিম তীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অধিকার ও সম্মতির বিষয়টি কেন্দ্রীয়। জর্ডানের ওপর প্রশাসনিক দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হলে ফিলিস্তিন সমস্যার মৌলিক রাজনৈতিক সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থেকে যায়।

নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের আহ্বান

বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মতো পদক্ষেপ বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

এ বক্তব্য জর্ডানের কূটনৈতিক অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এত দিন শান্তিচুক্তি বজায় রাখা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ইসরাইলকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা থাকলেও এখন আম্মান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো কার্যকর চাপের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।

তবে এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক বিবেচনা প্রয়োজন হবে। নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

ইসরাইল ও জর্ডানের শান্তিচুক্তি দুই দেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের অধিকার, পশ্চিম তীরে দখলদারত্ব এবং জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকলে এই সম্পর্কের ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে।

মেকেলবার্গের বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, ইসরাইলের বর্তমান সরকার একই নীতি অব্যাহত রাখলে জর্ডানের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে পারে। এতে শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নয়, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

মূল প্রশ্ন এখন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানে অগ্রগতি হবে কি না এবং ইসরাইল তার প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্বার্থের প্রতি কতটা সংবেদনশীল হবে। জর্ডানের সাম্প্রতিক বার্তা স্পষ্ট—ফিলিস্তিন সমস্যাকে অনির্দিষ্টকাল অমীমাংসিত রেখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন