আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের জন্য বিভিন্নভাবে বিশেষ নেয়ামত ও ফজিলত দান করেছেন। কখনো বিশেষ কোনো দিনকে, কখনো কোনো সময়কে, কখনো কোনো আমলকে এবং কখনো কোরআনের কোনো সুরা বা আয়াতকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। বিশেষ সুরাগুলোর একটি হচ্ছে সুরা কাহ্ফ।
আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত বিশেষ দিনগুলোর একটি জুমার দিন। সেই জুমার দিনে মুসলিম উম্মাহর জন্য রয়েছে ফজিলতপূর্ণ অনেক আমল। এগুলোর মধ্যে একটি আমল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে জুমার দিনে ‘সুরা কাহ্ফ’ তিলাওয়াত করা। সুরা কাহ্ফ পবিত্র কোরআনের ১৮ নম্বর সুরা। এর শুরু হয়েছে ১৫তম পারায় এবং এতে আয়াত রয়েছে ১১০টি।
জুমার দিনে ‘সুরা কাহ্ফ’ তিলাওয়াতের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহ্ফ পড়বে, তার (ঈমানের) নূর এই জুমা থেকে আগামী জুমা পর্যন্ত চমকাতে থাকবে।’ (মিশকাত)। সুরা কাহ্ফের আরো একটি বিশেষ ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা আমরা পবিত্র হাদিস থেকে জানতে পারি। বারাআ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি সুরা কাহ্ফ তিলাওয়াত করছিলেন। তার ঘোড়াটি দুটি রশি দিয়ে তার পাশে বাঁধা ছিল। তখন এক টুকরো মেঘ এসে তার উপর ছায়া দান করল। মেঘখণ্ড ক্রমেই নিচের দিকে নেমে আসতে লাগল। আর তার ঘোড়াটি ভয়ে লাফালাফি শুরু করে দিল। সকালবেলা যখন লোকটি নবী (সা.)-এর কাছে ওই ঘটনার কথা ব্যক্ত করেন, তখন তিনি বললেন, এ ছিল আস-সাকিনা (প্রশান্তি/ফেরেশতা), যা কোরআন তিলাওয়াতের কারণে নাজিল হয়েছিল।’ (বুখারি)
শুধু তা-ই নয়, সুরা কাহ্ফের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ফজিলত রয়েছে, সেটা হচ্ছে দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তির মাধ্যম। দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার জন্য সুরা কাহ্ফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ করার নির্দেশ হাদিসে এসেছে। অন্য একটি বর্ণনায় শেষ ১০ আয়াতের কথাও রয়েছে। এ সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সুরা আল-কাহ্ফের প্রথম ১০টি আয়াত মুখস্থ করবে তাকে দাজ্জালের অনিষ্ট হতে নিরাপদ রাখা হবে।’ (মুসলিম)। অন্য বর্ণনায় শেষ ১০ আয়াতের কথা রয়েছে।
দাজ্জালের ফিতনা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। শেষ যুগে বহু মানুষ দাজ্জালের ফিতনায় বিভ্রান্ত ও পরীক্ষিত হবে। দাজ্জালের ফিতনা কতটা ভয়ংকর হবে, তা কিছুটা আলোকপাত করা যাক। দাজ্জালের ফিতনাগুলোর অন্যতম একটি ভয়ংকর ফিতনা হবে, তার সঙ্গে এমন কিছু থাকবে, যা বাহ্যিকভাবে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো মনে হবে। কিন্তু বাহ্যিকভাবে যেটা জান্নাত দেখা যাবে, প্রকৃতপক্ষে সেটা হবে জাহান্নাম। যেটা দেখতে জাহান্নাম মনে হবে, সেটাই হবে জান্নাত। হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) দাজ্জাল সম্পর্কে বলেছেন, ‘দাজ্জালের আবির্ভাবকালে তার সঙ্গে পানি এবং আগুন থাকবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যা আগুন মনে হবে, প্রকৃতপক্ষে তা হবে ঠান্ডা পানি। আর যা পানি মনে হবে, সেটি হবে মূলত দাউ দাউ করা আগুন। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সেই সময়ের মুখোমুখি হবে, সে যেন দাজ্জালের আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে; কারণ সেটি হবে সুমিষ্ট ও শীতল পানি।’ (বুখারি ও মুসলিম)।
আমাদের সর্বদা যাবতীয় ফিতনা থেকে বেঁচে থাকতে হবে এবং দাজ্জাল থেকে দূরে থাকতে হবে। তাছাড়া দাজ্জালের আবির্ভাবের আগেও পৃথিবীতে নানা ধরনের ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। তাই নিজেদের সর্বদা হিফাজত করতে হবে। আর তার অন্যতম উপায় হচ্ছে সুরা কাহ্ফের তিলাওয়াত এবং প্রথম ও শেষ ১০ আয়াত মুখস্থ করা। দাজ্জালের আবির্ভাবের সময় মুসলিমদের জন্য মক্কা-মদিনায় অবস্থান করা নিরাপদ হবে। কারণ দাজ্জালের ফিতনার সময় মক্কা ও মদিনা বিশেষভাবে নিরাপদ থাকবে। দাজ্জাল এ দুই নগরীতে প্রবেশ করতে পারবে না। নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দাজ্জাল বের হওয়ার কথা শুনবে, সে যেন তার কাছে না যায়। আল্লাহর শপথ! এমন একজন লোক দাজ্জালের কাছে যাবে, যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। অতঃপর সে দাজ্জালের সঙ্গে প্রেরিত সন্দেহময় জিনিসগুলো ও তার কাজকর্ম দেখে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমানহারা হয়ে তার অনুসারী হয়ে যাবে।’ (আবু দাউদ)
দাজ্জালের ফিতনাগুলোর আরেকটি হচ্ছে, তার কপালে আরবি অক্ষরে কাফের লেখা থাকবে। কিন্তু অমুসলিম ও মোনাফেকরা তা পড়তে পারবে না, যদিও তারা শিক্ষিত হবে। আর ঈমানদাররা তা পড়তে পারবেন তারা নিরক্ষর হলেও। তাই এই ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য আমাদের ঈমানের যত্ন নেওয়া উচিত। সুরা কাহ্ফের তিলাওয়াত নিয়মিত করলে আমাদের ঈমান সেই ফিতনা মোকাবিলা করতেও প্রস্তুত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
দাজ্জালের আরো একটি ভয়ংকর ফিতনা হবে, দাজ্জাল মৃতকে জীবিত এবং জীবিতকে মৃত্যু দেওয়ার মতো ক্ষমতা পাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে। তার এই ক্ষমতায় অসংখ্য মুসলিম দ্বিধায় পড়ে ঈমানহারা হয়ে যাবে। দাজ্জাল তার কর্মকাণ্ডে শয়তানের সহযোগিতা নেবে। শয়তান কেবল মিথ্যা, গোমরাহি এবং কুফরি কাজেই সাহায্য করে থাকে। এ সম্পর্কে হাদিসের কিতাবে বর্ণিত আছে, নবী (সা.) বলেন, ‘দাজ্জাল মানুষের কাছে গিয়ে বলবে, আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করে দেখাই, তাহলে কি তুমি আমাকে প্রভু হিসেবে মানবে? সে বলবে, অবশ্যই মানব। এ সুযোগে শয়তান তার পিতা-মাতার আকৃতি ধরে সন্তানকে বলবে, হে সন্তান! তুমি তার অনুসরণ করো। সে তোমার প্রতিপালক।’ (ইবন মাজাহ)
এমন কঠিন অবস্থায় কীভাবে মুসলিমদের ঈমান রক্ষা করা সম্ভব? যখন একজন সাধারণ মুসলিম চোখের সামনে জান্নাত-জাহান্নাম দেখতে পাবে। তখন স্বাভাবিকভাবেই জান্নাতের দিকে অগ্রসর হবে। সে বুঝতেও পারবে না, সেটা যে ধোঁকা, সেটাই জাহান্নাম। যখন তার মৃত পিতা-মাতা জীবিত হয়ে দাজ্জালকে প্রতিপালক মানতে বলবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে বিশ্বাস করে নেবে। কারণ তখন অধিকাংশ মুসলিমের ঈমান হবে দুর্বল। সেই কঠিন মুহূর্তেও একজন মুসলিম নিজের ঈমানের হিফাজত করবেন এই সুরার মাধ্যমে। তাছাড়া এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত এই সুরা তিলাওয়াতকারীর জন্য নূর হয়ে থাকবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, আল-কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


