ভোরবেলা স্কুলের পথে হাজার হাজার শিশুর ব্যাগ কাঁধে হাঁটা, বছর শেষে ফলের দিন টিভি ক্যামেরার সামনে উচ্ছ্বসিত মুখ, আবার কয়েক বছর পর সেই একই মুখÑএখন আর কিশোর নয়, তরুণ-চাকরির দরখাস্ত হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে, চোখে ক্লান্তি, বুকে একটা চাপা প্রশ্নÑএত পড়লাম, তবু কেন কিছু হলো না?
এ প্রশ্নটাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন। কাগজে-কলমে আমরা এগিয়েছি অনেক—স্কুলে ভর্তি প্রায় সবার, পাসের হার বছর বছর বাড়ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও বহুগুণ। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে একটা নীরব সত্য লুকিয়ে আছে। ভালো ফল করেও অনেক শিক্ষার্থী নিজের বয়সের উপযোগী একটা লেখা ঠিকমতো বুঝতে পারে না, সাধারণ একটা অঙ্ক কষতে হিমশিম খায়। শিক্ষাবিদরা এটাকে বলেন ‘শেখার দারিদ্র্য’—অর্থাৎ সার্টিফিকেট আছে, কিন্তু আসল শেখাটা নেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার শিকড় বহু পুরোনো, ঔপনিবেশিক আমলের সেই পরীক্ষানির্ভর কাঠামোয়, যা তৈরি হয়েছিল মানুষকে বাছাই করার জন্য, মানুষ গড়ার জন্য নয়। স্বাধীনতার পরও আমরা সেই কাঠামো ভেঙে নতুন কিছু গড়ার বদলে তাকেই আরো বড় করেছি, কারণ একটা সংখ্যা—পাসের হার, জিপিএ ৫ দিয়ে ‘উন্নয়ন’ দেখানো সহজ। কিন্তু সংখ্যা যত বাড়ে, প্রশ্নটা ততই গভীর হয়—আমরা কি সত্যিই শিখছি, নাকি শুধু পরীক্ষার প্যাটার্ন মুখস্থ করছি? কোচিং সেন্টার আর গাইডবইয়ের একটা সমান্তরাল জগৎ গড়ে উঠেছে, যেখানে টাকা থাকলে ভালো ফল কেনা যায়, না থাকলে পিছিয়ে পড়তে হয়। যে শিক্ষা একদিন মানুষকে সমান সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল, সে-ই আজ নতুন করে বৈষম্য তৈরি করছে।
কিন্তু এই আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বরটাই আমরা প্রায়ই শুনি না, যা তরুণের নিজের কথা। তারা কী চায়, তারা কীভাবে তাদের নিজের শিক্ষাকে নিয়েÑএই প্রশ্নটা নীতিনির্ধারকের টেবিলে খুব কমই পৌঁছায়। অথচ যে প্রজন্ম রাস্তায় নেমে একটা রাষ্ট্র বদলে দিতে পারে, তাদের কাছে শিক্ষা মানে আর শুধু বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করা নয়। তারা প্রশ্ন করতে শিখেছেÑকেন এত বছর ধরে যা পড়লাম, তার সঙ্গে বাস্তব জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই? কেন আমার মেধা মাপা হয় শুধু একটা পরীক্ষার খাতায়?
একজন তরুণের মনে যে ভাবনাটা আজ সবচেয়ে জোরালো, তা হলোÑশিক্ষা যেন তাকে শুধু একজন ভালো পরীক্ষার্থী না বানিয়ে একজন সক্ষম মানুষ বানায়। এই আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাহ্য করলে শিক্ষাব্যবস্থা যতই সংস্কার হোক, তা তরুণের কাছে পরের মতোই থেকে যাবে, তার নিজের মনে হবে না। তাই যেকোনো প্রকৃত পরিবর্তনের শুরুটা হওয়া উচিত তরুণের নিজের ভাবনাকে জায়গা দিয়ে। তাকে শোনার মধ্য দিয়ে, তার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়ে, কারিকুলাম তৈরির টেবিলে তাকে বসিয়ে।
আমাদের শিক্ষা এতদিন একটাই স্বপ্ন দেখিয়েছে—ভালো ফল করো, একটা ভালো চাকরি পাবে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় এই স্বপ্নটা আর টেকে না। প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে ঢোকে অথচ চাকরির সংখ্যা সেই তুলনায় বাড়ছে না। তাহলে প্রশ্নটা বদলাতে হবে—শুধু ‘চাকরি কীভাবে পাব’ নয়, বরং ‘চাকরি কীভাবে তৈরি করব’।
বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে আছে তার ইতিহাসের এক বিরল মুহূর্তে—জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশ এখন কর্মক্ষম বয়সে। একে বলে জনমিতিক লভ্যাংশ। এই সুযোগ হাতে নিয়েই দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনামের মতো দেশ অল্প সময়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু এই সুযোগ আপনা-আপনি আশীর্বাদ হয়ে যায় না। এটা তখনই কাজে লাগে, যখন এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর হাতে থাকে প্রকৃত দক্ষতা আর অর্থনীতি তাদের জন্য জায়গা তৈরি করে রাখে।
আমাদের ক্ষেত্রে ঘটছে উল্টো কথা। একদিকে লাখ লাখ তরুণ প্রস্তুত, অন্যদিকে তাদের হাতে বাজার-উপযোগী দক্ষতা নেই। ফলে চাকরি খালি পড়ে থাকে, উপযুক্ত মানুষ মেলে না—আবার হাজার হাজার সার্টিফিকেটধারী তরুণ বসে থাকে বেকার। এই ফাঁকটা যত দিন থাকবে, জনমিতিক লভ্যাংশ ততই আশীর্বাদের বদলে বোঝায় পরিণত হবে। আর এই সুযোগের একটা সময়সীমাও আছে—কয়েক দশক পর এই জানালা বন্ধ হয়ে যাবে, যখন জনসংখ্যার বয়স বাড়তে শুরু করবে। যে জানালা আজ খোলা, তা চিরকাল খোলা থাকবে না।
এই স্কিল-গ্যাপ আর কর্মহীনতার সবচেয়ে করুণ প্রতিফলন দেখা যায় তরুণের মনে। বছরের পর বছর পড়াশোনা করে, পরিবারের স্বপ্ন আর খরচ বহন করে, যখন একজন তরুণ দেখে তার সার্টিফিকেট তাকে কোনো নিশ্চয়তা দিচ্ছে না, তখন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে একটা মানুষ। এটা শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটা নিজের পরিচয় নিয়ে সংকট। সমাজ যখন একজন মানুষের মূল্য মাপে শুধু তার চাকরি আর আয় দিয়ে আর সেই মানুষ যখন বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়, তখন হতাশা জমতে জমতে একদিন সহ্যের বাঁধ ভেঙে যেতে পারে।
এই ব্যাপক হতাশার সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি দেখা যায় রাজনীতির মাঠে। যে তরুণের সামনে সৎপথে বাঁচার রাস্তা বন্ধ, তার কাছে দলীয় পেশিশক্তির অংশ হওয়া, চাঁদাবাজি বা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়াÑপ্রায়ই একমাত্র বাস্তবসম্মত ‘আয়ের পথ’ হয়ে দাঁড়ায়। এটা নতুন কোনো গল্প নয়। আমাদের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে হল দখল, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিÑ এসব বহুদিন ধরে বেকার তরুণের জন্য একধরনের ‘অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান’ হয়ে কাজ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এই হতাশ তরুণদের সংগঠিত করা সহজ, কারণ তাদের হারানোর কিছু নেই।
এখান থেকে জন্ম নেয় একটা বিপজ্জনক চক্র। বেকারত্ব সহিংসতার জ্বালানি জোগায়, সহিংসতা বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থান আটকে দেয় আর তাতে বেকারত্ব আরো বাড়ে। জুলাই বিপ্লবের পর এই ঝুঁকি আরো প্রাসঙ্গিকÑতরুণরা রাষ্ট্র বদলে দিয়েছে নিজের হাতে, তাদের মনে জন্ম নিয়েছে একটা কর্তৃত্বের বোধ। কিন্তু এই বোধ যদি বাস্তব জীবনযাপনের পরিবর্তনে রূপ না নেয়, তাহলে এই একই শক্তি হতাশা থেকে নতুন সংঘাত বা উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকতে পারে। যতদিন একজন তরুণের কাছে সৎপথের চেয়ে বেপথে চলা সহজ ও লাভজনক মনে হবে, ততদিন এই চক্র ভাঙা কঠিন। শিক্ষা তখনই এই সমীকরণ বদলাতে পারবে, যখন সে সত্যিই তরুণের সামনে বিকল্প পথÑচাকরি, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, সামাজিক মর্যাদা হাতে তুলে দিতে পারবে।
এই পুরো আলোচনার একটা গভীরতর দিক আছে, যা শুধু নীতি সংস্কার দিয়ে ধরা যায় না। আমরা যদি শুধু জিপিএ ৫ আর দক্ষতার সমীকরণেই আটকে থাকি, তাহলে জাতি গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটাই বাদ পড়ে যায়Ñনৈতিক শিক্ষা। একজন তরুণ দক্ষ কারিগর হতে পারে, দক্ষ প্রকৌশলী হতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে যদি সততা, ন্যায়বোধ আর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকে, তাহলে সেই দক্ষতা সমাজের কল্যাণে নয়, ব্যক্তিস্বার্থে বা দুর্নীতিতেই ব্যবহৃত হয়।
আমরা যে দুর্নীতি আর প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিদিন লড়ি, তার শিকড় আসলে আমাদের শিক্ষার নৈতিক শূন্যতায়। পরীক্ষানির্ভর ব্যবস্থা শেখায় কীভাবে পাস করতে হয়, দক্ষতানির্ভর ব্যবস্থা শেখায় কীভাবে কাজ করতে হয়। কিন্তু কোনোটাই আপনা-আপনি শেখায় না কীভাবে সৎ থাকতে হয়, কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে হয়। যতদিন না নৈতিক শিক্ষা আমাদের কারিকুলামের কেন্দ্রে জায়গা পাচ্ছে, ততদিন আমরা এমন একটা প্রজন্ম তৈরি করে যাব, যারা হয়তো দক্ষ, কিন্তু সমাজ গড়ার নৈতিক ভার বইতে অক্ষম।
আসল সমাধান লুকিয়ে আছে একটা সহজ সত্যে। দক্ষতা ছাড়া কর্মসংস্থান হয় না আর সততা ছাড়া সেই কর্মসংস্থান জাতি গড়ে তোলে না। একজন দক্ষ কিন্তু অসৎ মানুষ দুর্বল ভিত গড়ে তোলে, যা একদিন ভেঙে পড়ে মানুষের মাথার ওপর; একজন সৎ কিন্তু অদক্ষ মানুষ সমাজের প্রকৃত প্রয়োজন মেটাতে পারে না। তাই আমাদের শিক্ষাকে দাঁড়াতে হবে দুই পায়ের ওপরই। একদিকে বাস্তব, বাজার-উপযোগী দক্ষতা, যা তরুণের হাতে তুলে দেবে জীবিকার সুযোগ আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস, চাই সে চাকরি হোক বা নিজের গড়া উদ্যোগ; অন্যদিকে গভীর নৈতিক শিক্ষা, যা সেই দক্ষতাকে ঠিক পথে চালিত করবে। দক্ষতা আমাদের আগামীর অর্থনীতি গড়ে তুলবে, সততা গড়ে তুলবে সেই অর্থনীতিতে বাস করার যোগ্য একটা সমাজ। এই দুটো প্রদীপ একসঙ্গে না জ্বললে, অন্ধকার কাটবে না। আর জাতি গঠনের স্বপ্নও অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
লেখক : শিক্ষক, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

