ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছয় দিনব্যাপী দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শনিবার তেহরানে শুরু হতে যাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের চার মাসেরও বেশি সময় পর এই আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তারা একে 'শতাব্দীর সেরা দাফনের আনুষ্ঠানিকতা বলে অভিহিত করছেন।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই আয়োজনে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। ইরানে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য এর আগে কখনো এত বড় প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি।
বিশাল প্রস্তুতি ও অতিথি তালিকা
আয়োজনের অংশ হিসেবে শোকাকুল মানুষের জন্য হাজারো সেবাকেন্দ্র খোলা হয়েছে। ১০ লাখের বেশি দর্শনার্থীর থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের জন্য তেহরানের কেন্দ্রস্থলজুড়ে নির্দিষ্ট পথ নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো কার্যক্রমের দায়িত্বে রয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তেহরানভিত্তিক ইউনিট 'মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোর'।
এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তেহরানে আসা রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, কারা উপস্থিত থাকছেন আর কারা দূরে থাকছেন উভয় বিষয়ই সমান গুরুত্ব বহন করছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অসংখ্য দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লমেন্টের স্পিকার ও মন্ত্রীরা এতে অংশ নেবেন। প্রায় ৮০০ বিদেশি সাংবাদিক অনুষ্ঠানটি কভার করবেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও জানাজায় যোগ দিতে তেহরানে গেছেন। এই জানাজার প্রতীক হিসেবে মুষ্টিবদ্ধ হাত এবং স্লোগান হিসেবে ‘আমাদের জেগে উঠতেই হবে’ নির্ধারণ করা হয়েছে।
৬ দিনের কর্মসূচি
শনিবার ও রোববার
শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। রোববার বিকেল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হবে। দর্শনার্থীরা যেন ১৫ থেকে ২০ মিনিটে শ্রদ্ধা জানিয়ে বের হতে পারেন, সেই পরিকল্পনা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার
আয়োজনটি তেহরানের দক্ষিণে কোম শহরে নেওয়া হবে। সেখানে জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজে ইমামতি করবেন শিয়াদের একজন জ্যেষ্ঠ আলেম।
বুধবার
খামেনির লাশ ইরাকের নাজাফে নেওয়া হবে। এরপর কারবালায় ইসলামের খলিফা হযরত আলীর (রা.) সমাধিস্থলে আনুষ্ঠানিকতা পালন করে লাশ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। ইরাকের বিভিন্ন গোষ্ঠীর অনুরোধে এই কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শিয়া বিশ্বে খামেনির প্রভাব ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক সম্পর্ক তুলে ধরতেই এই আয়োজন। বাগদাদ সফর করা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এর 'প্রতীকী গুরুত্বের' কথা উল্লেখ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (দাফন)
খামেনিকে তার জন্মশহর মাশহাদে দাফন করা হবে। ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ইমাম রেজার সমাধিস্থলে তাকে সমাহিত করা হবে।
দাফনের পর সারা দেশে আরো ৪০ দিন শোকানুষ্ঠান চলবে। প্রথম বার্ষিকী পর্যন্ত বিভিন্ন স্মরণসভার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজনৈতিক গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, এই শেষকৃত্যের বড় রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এটি ইরানি রাষ্ট্রের ঐক্য প্রদর্শনের সুযোগ। এছাড়া খামেনি পরবর্তী ক্ষমতার কাঠামো সুসংহত করা এবং তার ছেলে মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন জোরদার করার ক্ষেত্রে এটি প্রতীকী ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, এই জনসমাবেশ ইরানের গভীর সামাজিক বিভাজন দূর করতে পারবে না।
ব্যাপক প্রস্তুতি সত্ত্বেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে
ছেলেরা উপস্থিত থাকবেন কি-না
গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে খামেনির ছেলেদের আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তাছাড়া, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় মোজতবা খামেনির স্ত্রীসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ার পর তার নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে।
আয়োজক কমিটির সম্পাদক আলী আকবর পুরজামশিদিয়ান জানান, মোজতবা উপস্থিত থাকবেন কি-না তা সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় ও সশস্ত্র বাহিনী থেকে জানানো হবে।
জানাজায় ইমামতি কে করবেন
শিয়া ঐতিহ্যে এই ভূমিকার বড় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, মোজতবা খামেনি যদি এই অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে উপস্থিত হন, তবে তা ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সম্পর্কে একটি বড় ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


