ঢাবিতে প্রচলিত সান্ধ্য আইন নিয়ে নারী শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে

ঢাবিতে প্রচলিত সান্ধ্য আইন নিয়ে নারী শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোতে রাতের নির্ধারিত সময়সীমা, প্রবেশে কড়াকড়ি এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধকে কেন্দ্র করে প্রচলিত সান্ধ্য আইনের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

এসব নিয়মকে হয়রানিমূলক ও বৈষম্যমূলক দাবি করে তা প্রত্যাহার এবং নারী শিক্ষার্থীদের ন্যায্য প্রবেশাধিকার ও মৌলিক সুবিধা নিশ্চিতের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এসব দাবি বাস্তবায়নে সাত দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

সোমবার দুপুরে উপাচার্যের কার্যালয়ে ‘বৈষম্যহীন নারী হল চাই’ প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল সংসদের সংস্কৃতি সম্পাদক হুমায়রা উপন্যাস বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান ভিন্ন হলেও নারীর অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সবাই একমত হয়েছেন। এ লক্ষ্যেই রোববার (২৬ জুলাই) রাতে ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায় বিভিন্ন হলের নারী প্রতিনিধিদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভা থেকেই ‘বৈষম্যহীন নারী হল চাই’ নামে নতুন প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকেই উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে এবং দাবি আদায়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রী হলে এমন কিছু নিয়ম ও প্রশাসনিক চর্চা চালু রয়েছে, যা নারী শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

নিরাপত্তার অজুহাতে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ, নির্ধারিত সময়ের পর হলে প্রবেশে জটিলতা এবং পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও অযৌক্তিক বাধা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত হয়রানির মুখে ফেলছে।

এ প্রেক্ষাপটে স্মারকলিপিতে তিনটি প্রধান দাবি উত্থাপন করা হয়। প্রথমত, বৈধ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে আবাসিক ও অনাবাসিক সব নারী শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ছাত্রী হলের মূল ফটকের সময়সীমা বৃদ্ধি করতে হবে এবং বৈধ পরিচয়পত্র দেখিয়ে যেকোনো সময় লেট গেট দিয়ে হলে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে হল থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়াও হয়রানিমুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার শর্তে আবাসিক শিক্ষার্থীদের মা ও বোনদের হলের অভ্যন্তরে, এমনকি রুম পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে।

এ ছাড়া স্মারকলিপিতে ছাত্রী হলগুলোতে প্রচলিত সান্ধ্য আইন বা কার্যত কারফিউ ব্যবস্থা বাতিল করে ২৪ ঘণ্টা নিয়মতান্ত্রিক প্রবেশ ও বহির্গমনের সুযোগ নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে বৈধ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অন্য ছাত্রী হলে প্রবেশ এবং অনুমতি সাপেক্ষে রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখার প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।

স্মারকলিপি প্রদান শেষে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান জেরিন বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই অযৌক্তিক নিয়ম আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রত্যাহার না করা হলে আমরা কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হব।”

কুয়েত মৈত্রী হল সংসদের ভিপি রাফিয়া রেহনুমা হৃদি বলেন, “যুগ যুগ ধরে চলা এসব অযৌক্তিক কড়াকড়ি নারীদের বন্দী করে রাখার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। অবিলম্বে এসব বৈষম্যমূলক ও হয়রানিমূলক নিয়ম প্রত্যাহার করতে হবে।”

প্ল্যাটফর্মের অন্যতম উদ্যোক্তা ও কবি সুফিয়া কামাল হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) সানজানা চৌধুরী রাত্রি বলেন, “গতকালের সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী হলগুলোতে নারীদের প্রতি যে হয়রানি ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় এবং যেসব নিয়ম চালু রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করি। এসব সমস্যার সমাধানে কীভাবে একসঙ্গে কাজ করা যায়, তা নিয়েও মতবিনিময় হয়। সেই আলোচনা থেকেই ‘বৈষম্যহীন নারী হল চাই’ প্ল্যাটফর্ম গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আজ সেই প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকেই আমরা উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে আমাদের দাবিগুলো তুলে ধরেছি।”

ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক চেমন ফারিয়া ইসলাম মেঘলা বলেন, “আমরা মূলত তিনটি দাবি নিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেছি। ছাত্রী হলে প্রচলিত সান্ধ্য আইন বা কারফিউ বাতিল করে ২৪ ঘণ্টা গেট খোলা রাখতে হবে। বৈধ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের যেকোনো ছাত্রী হলে প্রবেশ এবং অনুমতি সাপেক্ষে রাত্রিযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পরিবারের নারী সদস্যদের হলের রুম পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।”

উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি প্রদানকালে ডাকসুর গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক সানজিদা আহমেদ তন্বী, ডাকসু সদস্য হেমা চাকমা, ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক চেমন ফারিয়া ইসলাম মেঘলা, কবি সুফিয়া কামাল হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) সানজানা চৌধুরী রাত্রি, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল সংসদের সংস্কৃতি সম্পাদক হুমায়রা উপন্যাসসহ বিভিন্ন হলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন