মরুভূমির ‘মিষ্টি সোনা’ এখন চাষ হচ্ছে পাবনায়। চার বছর আগে মাত্র চারটি খেজুর গাছের চারা রোপণ করেন আটঘরিয়ার তরুণ উদ্যোক্তা সাইফুদ্দিন হিরু। এখন তার খেজুরবাগান বিস্তৃত ৩৩ শতাংশ জমিতে। নানা প্রতিবন্ধকতা ও সংশয় পেরিয়ে তার বাগানে এখন আজওয়া, মরিয়ম, মেজুলসহ বিভিন্ন জাতের ৬০টি খেজুরগাছ রয়েছে। গাছে গাছে ফলন দেখে আশাবাদী স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগ।
হিরু খেজুর চাষের এই যাত্রা শুরু করেন ২০২২ সালে। শখের বশে গয়েশপুর এলাকার রাজিব নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে মাত্র চারটি চারা সংগ্রহ করে বাগানের যাত্রা শুরু করেন তিনি। এর জন্য বেছে নেন ৩৩ শতাংশ জমি। শুরুতেই তাকে সামাজিক ও পরিবেশগত নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়া ও অতিরিক্ত বৃষ্টি খেজুর চাষের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। এ বিষয়ে স্থানীয় অভিজ্ঞ কৃষকেরাও তাকে নিরুৎসাহিত করেন।
তবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ইন্টারনেট ও ইউটিউবের মাধ্যমে খেজুরের চাষ সম্পর্কে জানতে শুরু করেন হিরু। হাল না ছেড়ে কৌশলগতভাবে এগিয়ে যেতে থাকেন। বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে—এমন জাত খুঁজতে শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তার বাগানে আজওয়া, মরিয়ম, মেজুল, ছুক্কারি, ওয়ারহিছ, বড়ইসহ প্রায় ১০-১২টি উন্নত জাত রয়েছে। বাগানে গাছের সংখ্যা এখন ৬০। গাছ থেকে উৎপাদিত নতুন চারা বা ‘সাকার’ দিয়ে বাগান আরো বড় করার পরিকল্পনা করছেন তিনি।
এদিকে হিরুর েই সাফল্য দেখতে এখন প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বাগানের ভিডিও দেখে চাটমোহর থেকে ফেরার পথে টেবুনিয়ার কৃষক হাসানও বাগানটি দেখতে আসেন। গাছে গাছে খেজুরের ফলন দেখে তিনি আপ্লুত।
একদন্ত এলাকার তরুণ রুহুল আমিন বলেন, হিরু প্রমাণ করেছেন, সঠিক চেষ্টা থাকলে মরুভূমির ফলও দেশের মাটিতে ফলানো সম্ভব। তবে পাবনা শহর থেকে আসা কলেজছাত্র রাফিনের মতো অনেকের মনেই এখন প্রশ্ন—মরুভূমির খেজুরের মতো এ খেজুরও কি সমান সুস্বাদু হবে? স্বাদের ওপরই নির্ভর করছে এই চাষের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিকীকরণ।
সফলতার অনুভূতি প্রকাশ করে হিরু বলেন, শুরুতে যখন মানুষ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত, খুব কষ্ট হতো। কিন্তু আমি দমে যাইনি। আজ যখন গাছে গাছে ফল, তখন সব কষ্ট সার্থক মনে হয়। তবে বাণিজ্যিকভাবে এটিকে বড় করতে হলে এখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সহায়তার প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘উদ্যোক্তা সাইফুদ্দিন হিরু ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সফল হয়েছেন। তবে মরুভূমির তুলনায় এ দেশের মাটিতে গাছ ও খেজুরের বৃদ্ধির হার কিছুটা কম। এই প্রবৃদ্ধি কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আমাদের কৃষি বিভাগ কাজ করছে এবং বাগানটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে।’
তিনি আরো জানান, খেজুরের স্বাদ ও বাজারদর সন্তোষজনক হলে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই-বাছাই করে পুরো জেলায় এর চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।
পাবনা জেলায় এটিই প্রথম বাণিজ্যিক খেজুর চাষের উদ্যোগ। হিরুর সাফল্য জানান দিচ্ছে—সঠিক জাত নির্বাচন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বাংলাদেশের মাটিতেও বিদেশি খেজুর চাষ সম্ভব। সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেলে এই ‘মিষ্টি সোনা’ দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সফলতা ধরে রাখতে পারলে বিদেশি জাতের খেজুর চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

