চীনা শিল্পপণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের সরবরাহব্যবস্থায় চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে ইউরোপীয় শিল্পখাতে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হয়েছে। চলতি বছরই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শিল্পখাতে প্রায় ৩ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছে ইউরোপের ধাতু ও শিল্পপণ্য সংশ্লিষ্ট সংগঠন ইউরোমেটাল। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, চীন ধীরে ধীরে ইউরোপের শিল্প সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে।
ইউরোমেটালের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার জুলিয়াস পরিস্থিতিকে শিল্পের ‘উপনিবেশায়ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার অভিযোগ, চীনা উৎপাদকরা কম খরচে বিপুল পরিমাণ ধাতু, রাসায়নিক ও অন্যান্য শিল্পপণ্য ইউরোপের বাজারে ঢোকাচ্ছে। এসব পণ্য ইউরোপের প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদনশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে স্থানীয় উৎপাদকরা বাজার হারাচ্ছেন এবং কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।
ইউরোপীয় শিল্পখাতের অভিযোগ, চীনা উৎপাদকদের ব্যয়ের সুবিধার অন্যতম কারণ হলো তুলনামূলক কম শুল্ক ও কার্বন ব্যয়। এর সঙ্গে চীনা মুদ্রার মূল্য এবং দেশটির ব্যাপক শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর পক্ষে একই দামে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাম্প্রতিক এক গবেষণাতেও চীনের শিল্পখাতের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতাকে ইউরোপীয় নির্মাতাদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চাপটি শুধু ধাতু বা যন্ত্রাংশ শিল্পে সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের গাড়ি শিল্পও চীনা প্রতিযোগিতার কারণে বড় ধরনের পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জার্মান গাড়ি নির্মাতা ভক্সওয়াগেন সম্প্রতি ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার কর্মসংস্থান কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটি চীনা নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং দুর্বল চাহিদাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে। ভারতের টাটা মোটরসের মালিকানাধীন জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার প্রায় ৪ হাজার ব্যবস্থাপনা ও বেতনভুক্ত পদ কমানোর পরিকল্পনা করছে। কোম্পানিটি বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, বাড়তি শুল্ক এবং চীনা গাড়ি নির্মাতাদের তীব্র প্রতিযোগিতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ইউরোমেটাল বলছে, সমস্যা শুধু চীনা পণ্যের আমদানি নয়; বরং ইউরোপের উৎপাদনব্যবস্থা এমনভাবে চীনা উপকরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে যে ভবিষ্যতে সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে ইউরোপের কারখানাগুলোর উৎপাদনও থমকে যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব গবেষণাতেও চীন, তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থায় নির্ভরতার বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ভারসাম্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই পক্ষের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। এই ভারসাম্যহীনতা কমাতে ব্রাসেলস ও বেইজিং তিন মাসের আলোচনায় রয়েছে। তবে শিল্পখাতের নেতাদের আশঙ্কা, শুধু আলোচনা যথেষ্ট নয়; ইউরোপকে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা, সস্তা ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি এবং কৌশলগত সরবরাহব্যবস্থা পুনর্গঠনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইইউ ইতোমধ্যে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ইস্পাতের ওপর বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু ইউরোমেটালের মতে, এসব পদক্ষেপ সমস্যার মূল কারণ দূর করতে পারছে না। একই সঙ্গে ইউরোপে উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে শিল্পখাতে ১০ লাখেরও বেশি চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে বিভিন্ন ইউরোপীয় পূর্বাভাসে সতর্ক করা হয়েছে।
ইউরোপীয় শিল্পের এই সংকট মূলত বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। একসময় কম খরচের পণ্য উৎপাদনে চীনকে প্রধান প্রতিযোগী হিসেবে দেখা হলেও এখন দেশটি গাড়ি, ব্যাটারি, ইস্পাত, রাসায়নিক, যন্ত্রাংশ ও উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের মতো কৌশলগত খাতেও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে ইউরোপের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই নিজস্ব শিল্পভিত্তি ধরে রাখবে, নাকি সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে আরো কঠোর বাণিজ্যিক ও শিল্পনীতি গ্রহণ করবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

