নেপালের ত্রিশূলী নদীর তীরে কাদায় ভরা বিশাল সুড়ঙ্গপথে ৬০০-এর বেশি শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন। তাদের জীবিত উদ্ধারের আশায় অপেক্ষা করছেন স্বজনেরা। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে উদ্বেগ। উদ্ধারকারীরাও আশঙ্কা করছেন, জীবিতদের কাছে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
সোমবার ত্রিশূলী-৩-এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পৌঁছানোর চেষ্টা চালান উদ্ধারকারীরা। পাহাড়ের ঢালে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরির চেষ্টা করা হয়। এরপর সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস ঢোকানো শুরু হয়।
নিখোঁজ প্রকৌশলী অরুস ভান্ডারির স্ত্রী অনুশিলা ভান্ডারি বলেন, ‘আমি চাই আমরা তাকে খুঁজে পাই। আমি চাই তিনি বাড়ি ফিরে আসুন।’
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বন্যায় মৃত বেড়ে হয়েছে ৯৩৯ জন। নিখোঁজের সংখ্যা সংশোধন করে ৩ হাজার ৯২৫ জন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রায় সাতজনের একজন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সোমবার জানিয়েছেন, এসব প্রকল্প থেকে ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন ও নেপালের সামরিক সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও এতে যুক্ত রয়েছেন।
সোমবার একটি উদ্ধারকারী দল একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দিকে যাওয়া সুড়ঙ্গে ঢুকতে সক্ষম হয়। তবে সেখানে কাউকে না পেয়ে পরে ফিরে আসে।
এর আগে সপ্তাহের শেষ দিকে একটি সুড়ঙ্গে বাতাস ঢোকানোর কাজ শুরু করেন উদ্ধারকারীরা। তবে আটকে থাকা শ্রমিকদের স্বজনেরা বলছেন, এই ব্যবস্থা আরো আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
স্বামীকে উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা সিতা পান্ডে নেপালের দৈনিক কান্তিপুরকে বলেন, ‘আমি এখনো ৫০ শতাংশ আশা করি তিনি বেঁচে আছেন। কারণ সুড়ঙ্গের ভেতরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে।’
আরেক নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজন জীবন খাড়কা বলেন, ‘যত দেরি হচ্ছে, আমাদের আশা ততই কমে যাচ্ছে। এই অভিযান আরো দ্রুত করতে হবে। আমাদের কাছে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ।’
সুড়ঙ্গের চিহ্নও মিলছে না
অস্ট্রেলীয় প্রকৌশলী আর্নল্ড ডিক্স দূর থেকে নেপালের উদ্ধারকারীদের ভূগর্ভস্থ অনুসন্ধানে সহায়তা করছেন। তার ভাষ্য, উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
বিবিসি রেডিও ফোরকে ডিক্স বলেন, ‘সুড়ঙ্গগুলোর কোনো চিহ্নই আর নেই। সবকিছু যেন হারিয়ে গেছে। জায়গাটিকে চাঁদের পৃষ্ঠের মতো দেখাচ্ছে।’
তার মতে, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা গেলে সেখানে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ ঠিক করা সম্ভব হবে। এ ধরনের অভিযানে সাধারণত খনন করতে হয় এবং বড় পাথর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সরাতে হয়।
ডিক্স বলেন, কিছু পাথর বাড়ির চেয়েও বড়। জীবনে এমন কিছু আগে দেখেননি বলেও জানান তিনি।
তার মতে, এটি একটি ‘অসাধারণ’ উদ্ধার অভিযান।
তবে ভূগর্ভের পরিবেশ বন্যার পানির ভয়াবহতা থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়ে থাকতে পারে। এ কারণে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা এখনো দেখছেন ডিক্স।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প
নেপাল জলবিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটির পাহাড়ি নদীগুলো ঘিরে বছরের পর বছর ধরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বন্যায় নির্মিত বা নির্মাণাধীন অন্তত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শাহ বলেছেন, উদ্ধার অভিযান ‘আরো জোরদার’ করা হয়েছে। তিনি এই বন্যাকে ‘সাধারণ কোনো ঘটনা নয়’ বলে উল্লেখ করেছেন।
সোমবার রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শাহ বলেন, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নেপালে যে দুর্যোগ বাড়ছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জোরালোভাবে বিষয়টি তুলে ধরার সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছিলেন মিলান খারেল। বন্যার পর থেকে তার সন্ধানে অপেক্ষা করছেন বোন প্রিয়া খারেল।
প্রিয়া বলেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ফিরে আসা লোকজন জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে মানুষ ছিল। সেনাবাহিনী দ্রুত সেখানে পৌঁছাতে পারলে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব বলে আশা করছেন তিনি।
শনাক্ত করা যাচ্ছে না অধিকাংশ লাশ
বন্যায় মৃতদের শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বিবিসি নেপালিকে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রায় ৯০০ লাশের মাত্র ৪ শতাংশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
বন্যার স্রোতে ভেসে প্রায় ৩০০ লাশ চিতওয়ান জেলার নদীতীরে এসে পৌঁছেছে। সেখানে অস্থায়ীভাবে লাশ দাফন করা হচ্ছে।
সাদা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ও মাস্ক পরা কর্মীরা শনাক্ত না হওয়া লাশ ট্রাকে তুলছেন। লাশ পচে যাওয়ায় দুর্গন্ধে সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
শনিবার শহরের বাইরে একটি বনাঞ্চলের বড় অংশ খুঁড়ে রাখা হয়। চিকিৎসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা সেখানে পাওয়া অজ্ঞাত লাশ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছেন।
চিতওয়ানের জেলা প্রশাসক গণেশ আরিয়াল বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে লাশ শনাক্ত হওয়ার পর স্বজনেরা তাদের প্রিয়জনের দেহাবশেষ নিয়ে যেতে পারবেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে পর্যাপ্ত ফ্রিজার নেই। তাই অস্থায়ীভাবে দাফন করাই ছিল শেষ বিকল্প। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা সত্যিই হিমশিম খাচ্ছি।’
তিব্বতে ১৬ মৃত্যু, নিখোঁজ ৫৪৬
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে বন্যায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরো ৫৪৬ জন।
চীনে বন্যার ভিডিও ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সরকারি হিসাবের চেয়ে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা অনেক বেশি—অনলাইনে এমন দাবি বা অনুমান করায় কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ নেওয়া হয়েছে। এসব শাস্তির মধ্যে সতর্কবার্তা, জরিমানা ও স্বল্পমেয়াদি আটক থাকতে পারে।
নেপালেও বন্যা নিয়ে ভুল তথ্য হিসেবে বিবেচিত অনলাইন কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

