ইরানের ক্লাস্টারে বেকায়দায় পড়েছে ইসরাইলের বহুতর বিশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আয়রন ডোমকে ফাঁকি দিয়ে আঘাত হানছে ইরানের ‘ক্লাস্টার’ বা গুচ্ছ বোমা।
ইরানের সবচেয়ে উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খোররামশাহর। এটি অন্তত ৮০টি উপ-বোমা বা সাব-মিউনিশন বহন করতে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের ক্লাস্টার ইসরাইলের জন্য বড় আশঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে এসেছে, ইরানি হামলার প্রভাব এবং ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরু পর থেকে অন্তত ১৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্লাস্টার ওয়ারহেড নিয়ে ইসরাইলে আঘাত হেনেছে। এসব হামলায় নয়জন নিহত এবং ডজনখানেক আহত হয়েছেন।
এতে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বল দিকে প্রকাশ পেয়েছে। অপরদিকে ইরানের যুদ্ধকৌশলে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত এটি।
গুচ্ছ বোমা বা ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহার করে সর্বশেষ রোববার হামলা চালায় ইরারন। একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মধ্য ইসরাইলে আঘাত হানে। এঘটনায় ১৫ ইসরাইলি আহত হন। ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) জানায়, ইরান যতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই ছিল ক্লাস্টার ওয়ারহেড যুক্ত।
দেশটির প্রতিরক্ষা পরামর্শক ও ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ তাল ইনবার বলেন, সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় ক্লাস্টার বোমা আটকানো প্রযুক্তিগতভাবে অনেক বেশি কঠিন। এটি কার্যকরভাবে ঠেকাতে হলে ইন্টারসেপ্টরকে অবশ্যই মূল ক্ষেপণাস্ত্রটি বিস্ফোরণ বা উপ-বোমা ছড়িয়ে দেয়ার আগেই ধ্বংস করতে হবে।
ইসরাইলের অত্যন্ত উন্নত মাল্টি-টিয়ার প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক, যার মধ্যে আয়রন ডোমও রয়েছে, তা বিভিন্ন উচ্চতা ও গতির লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম। কিন্তু ক্লাস্টার বোমা মাঝ আকাশে ডজনখানেক ছোট বোমা ছড়িয়ে দেয়ায় এটি ইসরাইলি আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্লাস্টার বোমাগুলো বিশাল এলাকায় ছোট ছোট অনেক বোমা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তৈরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে বায়ুমণ্ডলের বাইরেই এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করা প্রয়োজন।
ক্লাস্টার বোমা প্রকৃতিগতভাবেই বাছবিচারহীন এবং জনাকীর্ণ এলাকায় এর ব্যবহার আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে নিষিদ্ধ। ২০০৮ সালের ক্লাস্টার মিউনিশন কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর জন্য এটি নিষিদ্ধ হলেও ইসরাইল বা ইরান কেউই এই চুক্তির পক্ষে ছিল না।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত জুন মাসে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের ‘চরম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছিল। সংস্থাটি ২০০৬ সালে লেবাননে এই অস্ত্র ব্যবহারের জন্য ইসরাইলকেও অভিযুক্ত করেছিল। ইসরাইল অতীতে এই অস্ত্র ব্যবহারের কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছে যে তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই তা করে।
ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, তেল আবিবের রাতের আকাশে ডজন ডজন উজ্জ্বল আলোকবিন্দু দ্রুতগতিতে নেমে আসছে এবং আঘাত হানছে।
এ ধরনের দুটি হামলায় তেল আবিবের পূর্বে রামাত গান এলাকায় সত্তরোর্ধ্ব এক দম্পতি এবং মধ্য ইসরাইলের আদানিম এলাকায় ৩০ বছর বয়সী এক থাই কর্মী নিহত হন। ইসরাইলি কর্মকর্তারা বলছেন, মূল ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি ধ্বংস করা হলেও অনেক সময় এর ভেতরে থাকা সব উপ-বোমা নিষ্ক্রিয় হয় না।
ইরানের এই কৌশলের একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্যও রয়েছে। ইসরাইলের আকাশসীমায় ছোট ছোট বোমা ঢুকিয়ে দেয়ার পাশাপাশি এর উদ্দেশ্য হতে পারে ইসরাইলের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমিয়ে ফেলা। অর্থাৎ, একটি মাত্র লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে ইসরায়েলকে ডজন ডজন দামি মিসাইল খরচ করতে হবে।
ইসরাইলের সামরিক বাহিনী দাবি, তারা ইরানের ৭০ শতাংশের বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে । ইরানের আকাশসীমার ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে । সপ্তাহান্তেও দক্ষিণ ইসরাইলের আরাদ ও ডিমোনা শহরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ২০০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয় গেছে।
ক্লাস্টার বোমার ব্যবহার ইসরাইলিদের মধ্যে ক্লান্তি ও হতাশা দেখা দিচ্ছে। এই যুদ্ধ আর কতদিন চলবে অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর সময় ইসরাইলও দক্ষিণ লেবাননে ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার করেছিল। গার্ডিয়ানের গত বছরের এক তদন্তে এমন তথ্য দেখা গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

