ফিলিস্তিনের অস্তিত্ব, অদৃশ্যতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সংকট

ফিলিস্তিনের অস্তিত্ব, অদৃশ্যতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সংকট

ফিলিস্তিন প্রশ্নকে সাধারণত রাষ্ট্র, সীমান্ত, দখলদারিত্ব, নিরাপত্তা কিংবা শান্তি-প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই দেখা হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনি জনগণের অভিজ্ঞতার আরো গভীরে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—তাদের কি রাজনৈতিক অধিকার দাবি করার আগেই নিজেদের অস্তিত্বের স্বীকৃতির জন্য লড়তে হয়েছে? জন র‌্যান্ডলফ লেব্ল্যাঙ্কের বই ‘দ্য স্পেকট্রাল প্যালেস্টিনিয়ান: প্রেজেন্স বিফোর পলিটিকস’ এই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। ২০২৬ সালে ব্লুমসবারি একাডেমিক থেকে প্রকাশিত ২১২ পৃষ্ঠার বইটিতে ফিলিস্তিনি লেখক সাঈদ নুসাইবেহ, মাহমুদ দারবিশ ও রাজা শেহাদেহর রচনার আলোকে ফিলিস্তিনের অস্তিত্ব, অদৃশ্যতা ও রাজনৈতিক এজেন্সি বা কর্তৃত্বের সংকট বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বইটির পর্যালোচক রামোনা ওয়াদির মতে, পশ্চিমা রাজনৈতিক ভাষ্যে ফিলিস্তিনিরা দীর্ঘদিন ধরে এক অদ্ভুত অবস্থানে আটকে আছেন—একদিকে তারা অদৃশ্য, অন্যদিকে প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের দৃশ্যমান করা হয়। অর্থাৎ ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক মানুষ, সমাজ ও জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাদের কখনো অসহায় জনগণ, কখনো নিরাপত্তা-ঝুঁকি, আবার কখনো সহিংসতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। লেব্ল্যাঙ্ক এই অবস্থাকে ‘স্পেকট্রাল’ বা ভূতের মতো উপস্থিতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

বিজ্ঞাপন

এই অদৃশ্যতার ইতিহাস সাম্প্রতিক নয়। বইটির আলোচনায় ১৯৪৮ সালের নাকবা, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ, পরবর্তী দখলদারিত্ব, বসতি সম্প্রসারণ এবং তথাকথিত শান্তি-প্রক্রিয়ার দীর্ঘ ইতিহাসকে একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। লেখকের যুক্তি হলো, ফিলিস্তিনিদের উপস্থিতিকে আড়াল করার ফলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও জনগণের ওপর সংঘটিত ঘটনাগুলোকে প্রায়ই বিচ্ছিন্ন ও তাৎক্ষণিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আড়ালে চলে যায়।

লেব্ল্যাঙ্কের বিশ্লেষণে রাজা শেহাদেহর লেখাগুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দখলদারিত্বের দিনলিপি ও অন্যান্য রচনায় শেহাদেহ দেখিয়েছেন, সামরিক দখল শুধু মানুষের চলাচল ও জীবনযাত্রাকে সীমাবদ্ধ করে না; এটি মানুষের আইনি ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়েও সংকট তৈরি করে। পশ্চিমা আইনি কাঠামোতে অধিকার, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইনের যে ভাষা ব্যবহৃত হয়, তা সব সময় দখলদারিত্বের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনিদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে ধারণ করতে পারে না—এমন সমালোচনা বইটিতে উঠে এসেছে।

মাহমুদ দারবিশের কবিতা ও লেখায় আবার ফিলিস্তিনি অস্তিত্বের আরেকটি দিক দেখা যায়। দারবিশের কাছে ফিলিস্তিনির অদৃশ্য হয়ে যাওয়া কেবল ভূমি হারানোর বিষয় নয়; এটি পরিচয়, স্মৃতি ও মর্যাদা হারানোর সঙ্গেও যুক্ত। নাকবার পর ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং পরবর্তী বসতি সম্প্রসারণের ফলে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের ভূমিতেই ক্রমশ সংকুচিত ও অদৃশ্য হয়ে পড়েছে—বইটির আলোচনায় দারবিশের সাহিত্যকে এই অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে দেখা হয়েছে।

সাঈদ নুসাইবেহর চিন্তা আবার ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সংকট সামনে আনে। ফিলিস্তিনি জনগণের রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা এবং নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তাঁর লেখায় তার প্রতিফলন রয়েছে। লেব্ল্যাঙ্ক নুসাইবেহর অবস্থানকে সমালোচনামূলকভাবে পাঠ করেছেন এবং এডওয়ার্ড সাঈদের সমালোচনার প্রসঙ্গও এনেছেন। বিশেষ করে ২০০২ সালের নুসাইবেহ-আয়ালন সমঝোতা নিয়ে সাঈদের আপত্তি বইটির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ওসলো শান্তি-প্রক্রিয়াকেও বইটি গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। রাজা শেহাদেহর মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি আলোচকেরাই কখনো কখনো নিজেদের প্রান্তিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে পড়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যে রাজনৈতিক কাঠামো ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পূর্ণ ক্ষমতা দেয় না, সেই কাঠামোর মধ্যে অংশগ্রহণ কি শেষ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক এজেন্সি বা নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আরও দুর্বল করে?

বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতকে প্রায়ই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন প্রতিটি নতুন সংঘর্ষই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এতে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা হারিয়ে যায়। ইসরাইলি সামরিক অভিযান বা প্রতিক্রিয়াকে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরলে দখলদারিত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সামগ্রিক ইতিহাস আড়ালে পড়ে যেতে পারে—লেব্ল্যাঙ্কের বিশ্লেষণে এই সমস্যাটি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ফিলিস্তিনিরা বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব দৃশ্যমানতা অর্জন করেছে—বইটির পর্যালোচনায় এমন একটি পর্যবেক্ষণও রয়েছে। কিন্তু দৃশ্যমানতা আর মর্যাদার স্বীকৃতি এক বিষয় নয়। গণমাধ্যমে ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেই যদি ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভাষায় নিজেদের ইতিহাস ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের সুযোগ না থাকে, তাহলে সেই দৃশ্যমানতাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। লেব্ল্যাঙ্কের বই মূলত সেই পার্থক্যটিই বোঝার চেষ্টা করেছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘দ্য স্পেকট্রাল প্যালেস্টিনিয়ান’ শুধু ফিলিস্তিন নিয়ে একটি বই নয়; এটি আধুনিক রাজনৈতিক ভাষা নিয়েও একটি প্রশ্ন। রাষ্ট্র, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, নিরাপত্তা এবং শান্তি—এই শব্দগুলো বিশ্বরাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত হলেও কোনো জনগোষ্ঠী যদি এই ভাষার মধ্যেই নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশের পর্যাপ্ত জায়গা না পায়, তাহলে সেই ভাষা কতটা সার্বজনীন—প্রশ্নটি সেখানেই।

ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে তাই হয়তো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নের পাশাপাশি আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন সামনে আনা প্রয়োজন—ফিলিস্তিনিদের কি প্রথমে একটি রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে নয়, একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখা হচ্ছে? কারণ কোনো জনগোষ্ঠীর কণ্ঠকে স্বীকৃতি না দিয়ে তার জন্য রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করা সম্ভব হলেও তা স্থায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। লেব্ল্যাঙ্কের বইয়ের মূল তাগিদ এখানেই—রাজনীতির আগে উপস্থিতি, রাষ্ট্রের আগে মানুষ এবং সমাধানের আগে কণ্ঠের স্বীকৃতি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন