পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। পূর্বঘোষিত এ কর্মসূচি ঠেকাতে ইসলামাবাদে হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন, মহাসড়ক বন্ধ এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে দেশটির সরকার।
২০২৩ সাল থেকে কারাগারে থাকা ইমরান খানের সঙ্গে আচরণ ও কারাবন্দি অবস্থার প্রতিবাদে এ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে পিটিআই। শুক্রবার দলটির নেতাদের মধ্যে কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছিল। রোববার থেকেই ধীরগতিতে ইসলামাবাদের দিকে যাত্রা শুরু করে সরকারকে চাপে ফেলার পরিকল্পনা হবে, নাকি কর্মসূচি আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হবে—তা নিয়ে মতবিনিময় করেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট হিসেবে বিবেচিত বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। দেশটির ক্ষমতাসীন জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তবে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে দেশটির রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়।
এদিকে চলতি সপ্তাহে পিটিআইয়ের বেশ কয়েকজন নেতা ও মন্ত্রীকে আটক করা হয়েছে অথবা তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ইমরান খানের নিজ প্রদেশ ও পিটিআইয়ের শক্ত ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে রয়েছেন। সেখান থেকেই হাজার হাজার সমর্থক ইসলামাবাদের উদ্দেশে যাত্রা করবেন বলে দলটি জানিয়েছে।
আফ্রিদি বলেন, ইমরান খানের কারাবাসের পরিস্থিতি ও তার মামলাগুলোর ন্যায়সংগত শুনানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকার উল্লেখযোগ্য ছাড় না দিলে পিটিআই কর্মসূচি থেকে সরে আসবে না।
তিনি বলেন, ‘সরকার আতঙ্কিত—এ কারণেই তারা ইসলামাবাদ অবরুদ্ধ করেছে এবং আমাদের মন্ত্রীদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইমরান খান দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা এবং তার জন্য মানুষ রাস্তায় নামবে। জনগণ রাস্তায় নেমে ইসলামাবাদের দিকে অগ্রসর হলে তাদের শক্তি থামানো সম্ভব হবে না।’
-10cada.jpg)
তবে আফ্রিদি স্বীকার করেন, বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের কারণে সমর্থকদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর আগে ইমরান সমর্থকদের বিক্ষোভ ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
সরকার ইতোমধ্যে খাইবার পাখতুনখোয়ায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে এবং প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারের সঙ্গে ইসলামাবাদের প্রধান সংযোগকারী মহাসড়ক বন্ধ করে দিয়েছে।
অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখোয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি সরকারের পদক্ষেপকে নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা হিসেবে উল্লেখ করে পিটিআইয়ের বিরুদ্ধে “অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা” তৈরির অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, “কোনো সহিংস গোষ্ঠীকে ইসলামাবাদের দিকে মার্চ করতে দিতে পারে না রাষ্ট্র।”
পিটিআই সমর্থকদের রাজধানীতে প্রবেশ ঠেকাতে নেওয়া পদক্ষেপে ইসলামাবাদ কার্যত একটি উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত নগরীতে পরিণত হয়েছে। সড়কে এক হাজারের বেশি কনটেইনার বসানো হয়েছে, কয়েকটিতে কাঁটাযুক্ত প্রতিবন্ধক স্থাপন করা হয়েছে। সেতুগুলোতে বালুর বস্তা রাখা হয়েছে এবং রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইসলামাবাদে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি রাজধানীজুড়ে প্রায় ২২ হাজার পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
সরকারের এই অবরোধে রাজধানীর বাসিন্দাদের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ পাচ্ছে না। ৭৬ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী শাহিদ বলেন, পুরো শহর ভুগছে। সরকার পুরো শহর বন্ধ করে দিয়েছে এবং নাগরিক হিসেবে আমরা অসহায়। এমন পরিস্থিতি আমি কখনো দেখিনি।
ইমরান খানের দলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা এবং তাকে জনপরিসর থেকে দূরে রাখার নানা সরকারি ও সামরিক প্রচেষ্টার পরও তিনি পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে অনেকের কাছে বিবেচিত হচ্ছেন। এমনকি দেশটির কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে তার নাম উল্লেখ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে পিটিআই অভিযোগ করেছে।
দলটির দাবি, ইমরান খানকে একাকী বন্দিত্বে রাখা হয়েছে এবং কয়েক মাস ধরে তাকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা, পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে এসব অভিযোগ নিয়ে সরকারের বক্তব্যও রয়েছে।
ইমরান খান তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার দাবি, সরকার ও সামরিক নেতৃত্বের জন্য তিনি রাজনৈতিক হুমকি হওয়ায় তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দেওয়া আদালতের অধিকাংশ রায়ই পরে বাতিল হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, পিটিআইয়ের এই বিক্ষোভ বড় ধরনের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক বিভিন্ন দেশে ব্যাপক গণবিক্ষোভের পর সরকার পরিবর্তনের উদাহরণ তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানি রাজনৈতিক কলামিস্ট নিয়াজ মুর্তজা বলেন, ‘পাকিস্তানে বর্তমানে অসন্তোষের পরিধি অনেক বিস্তৃত। অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ এবং দমন-পীড়নের মাত্রা বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি খুব দ্রুত বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠতে পারে।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এমএমআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


