সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যবসায়ী

থানা কম্পাউন্ডে আহত ৮ গরু জবাই, স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন

থানা কম্পাউন্ডে আহত ৮ গরু জবাই, স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন
থানা কম্পাউন্ডে আহত ৮ গরু জবাই, স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন। ছবি: আমার দেশ

গরু বিক্রি করে পরিবারের কাছে ফেরার কথা ছিল আব্দুস সালামের (৫৫)। রংপুর থেকে ১৮টি গরু নিয়ে কক্সবাজারের পথে বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সীতাকুণ্ডের পন্থিছিলায় গরুবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এই গরু ব্যবসায়ী। দুর্ঘটনায় মারা যায় পাঁচটি গরুও। পরে উদ্ধার হওয়া ১৩টি গরুর মধ্যে গুরুতর আহত আটটি গরু সীতাকুণ্ড থানা কম্পাউন্ডে জবাই করে মাত্র এক ঘণ্টায় মাংস বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আহত গরুগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মাংস বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুর ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনে সীতাকুণ্ড পৌরসভার পন্থিছিলা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আব্দুস সালাম কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ভালুকিয়াপালং ইউনিয়নের মাদারপাড়া গ্রামের মৃত মীর আহাম্মদের ছেলে। গরুর ব্যবসাই ছিল তার জীবিকার অন্যতম অবলম্বন।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় কয়েকজন গাড়িচালক জানান, বড়দারোগাহাট এলাকা পার হওয়ার পর থেকেই গরুবাহী ট্রাকটি অস্বাভাবিকভাবে চলছিল। কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে সরে যাচ্ছিল ট্রাকটি। চালকের ঘুম ঘুম ভাব কিংবা অসতর্কতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।

কুমিরা হাইওয়ে থানার ওসি মো. নুরুল আফসার আমার দেশকে বলেন, চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাকটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করা হচ্ছে। চালকের লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেসসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় যাচাই করা হবে।

দুর্ঘটনার পর জীবিত ১৩টি গরু উদ্ধার করে সীতাকুণ্ড থানায় নেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, এর মধ্যে গুরুতর আহত আটটি গরু পরে থানা কম্পাউন্ডেই জবাই করা হয়। নুরুদ্দিন নামে এক ব্যক্তি প্রায় চার লাখ টাকায় গরুগুলো কিনে নেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এরপর প্রতি কেজি সাড়ে ৬৫০ টাকা দরে সীতাকুণ্ড বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী, আশপাশের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কাছে মাংস বিক্রি করা হয় বলে স্থানীয়রা জানান। খবর ছড়িয়ে পড়লে থানা কম্পাউন্ডে ক্রেতাদের ভিড় জমে যায়। এক ঘণ্টার মধ্যেই আটটি গরুর মাংস বিক্রি হয়ে যায়। অনেকে মাংস কিনতে এসে খালি হাতেও ফিরে যান।

তবে গুরুতর আহত গরুগুলোর মাংস মানবভোগের উপযোগী ছিল কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েকটি গরুর অবস্থা ছিল গুরুতর এবং কোনো কোনো গরুর পেট ফুলে গিয়েছিল। এসব গরু জবাইয়ের আগে পশু চিকিৎসক কিংবা স্যানিটারি কর্মকর্তার মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছিল কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, দুর্ঘটনার শিকার কোনো গরু গুরুতর আহত বা অসুস্থ হলে জবাই ও মাংস বিক্রির আগে স্যানিটারি কর্মকর্তার মাধ্যমে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। মাংস মানুষের খাওয়ার উপযোগী কিনা, তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার পরই বিক্রির নিয়ম রয়েছে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি থানা কম্পাউন্ডে গরু জবাইয়ের অনুমতি কে দিয়েছেন। আহত গরুগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছিল কি-না। মাংস বিক্রির প্রক্রিয়া কার তত্ত্বাবধানে হয়েছে। কথিত চার লাখ টাকার ক্রয়মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ কার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব প্রশ্নের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন তারা।

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুর ইসলামের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল কেটে দেওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে আব্দুস সালামের মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গরু নিয়ে রংপুর থেকে কক্সবাজারের পথে বেরিয়েছিলেন তিনি। গন্তব্যে পৌঁছে গরু বিক্রি করে ঘরে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু পন্থিছিলার মহাসড়কেই শেষ হয়ে গেল সেই যাত্রা।

একদিকে উখিয়ায় স্বজনদের আহাজারি, অন্যদিকে দুর্ঘটনার পর থানা কম্পাউন্ডে মাংস কেনার হিড়িক। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা তাই শুধু একজন গরু ব্যবসায়ীর প্রাণহানির ঘটনা নয়, আহত পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মাংসের নিরাপত্তা এবং সরকারি স্থাপনায় জবাই ও বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়েও সামনে এনেছে গুরুতর প্রশ্ন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...