গত জুন মাস থেকে উত্তপ্ত পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর বা আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর (এজেডকে)। বিক্ষোভকারী ও যৌথ বাহিনীর সংঘাত, অবরোধ আর ধর্মঘটে গত কয়েক মাসে অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দুই সপ্তাহ বন্ধ ছিল ব্যাংকসেবা, মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগও পুরোপুরি বিছিন্ন রয়েছে অধিকাংশ এলাকায়। তীব্র এই অস্থিরতার মধ্যেই অঞ্চলটিতে শুরু হতে যাচ্ছে আইনসভার নির্বাচন। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই নির্বাচন ঘিরে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি)। সংগঠনটির আন্দোলন মূলত সস্তা আটা ও কম দামে বিদ্যুতের দাবিতে শুরু হলেও বর্তমানে তা ৩৮ দফা দাবিতে রূপ নিয়েছে। তবে আন্দোলনের কেন্দ্রে চলে এসেছে একটি মূল বিষয়—আইনসভায় শরণার্থী বা বাস্তুচ্যুত কাশ্মীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বিলুপ্ত করা।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ৪৫ আসনের আইনসভার সাধারণ নির্বাচনকে তিন দফায় ভাগ করা হয়েছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী মুজাফফরাবাদ ও শরণার্থীদের ১২ আসনের ভোট ২ আগস্ট এবং আন্দোলনের মূল কেন্দ্র পুঞ্চ বিভাগে আগামী ১০ আগস্ট ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। তবে জেএএসি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে সমর্থকদের ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়েছে।
সংরক্ষিত ১২ আসন ও আইনি জটিলতা
আজাদ কাশ্মীরের ৪৫টি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ৩৩টি সরাসরি অঞ্চলের বাসিন্দাদের ভোটে নির্ধারিত হয়। বাকি ১২টি আসন ভারতের আওতাধীন কাশ্মীর থেকে এসে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বাস করা শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। ১৯৬০ সালে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থা ১৯৭৪ সালের অন্তর্বর্তী সংবিধানে স্থায়ী রূপ পায়। সংবিধানে প্রায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার শরণার্থী ভোটারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি ও শিয়ালকোটের মতো পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে এই আসনগুলো বণ্টন করা রয়েছে।
জেএএসি নেতাদের দাবি, এই ১২ আসন সম্পূর্ণ আজাদ কাশ্মীরের একতিয়ারের বাইরে। এগুলো মূলত ইসলামাবাদকে মুজাফফরাবাদের সরকার গঠনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়। আন্দোলনকারীদের প্রস্তাব ছিল—কাশ্মীর সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এসব আসন বাদ দিয়ে কাশ্মীর কাউন্সিলে প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু গত ৩ জুন মুজাফফরাবাদে আয়োজিত সর্বদলীয় বৈঠকে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
পরবর্তীতে আজাদ কাশ্মীরের সুপ্রিম কোর্ট জানান, এটি সংবিধান সুরক্ষিত একটি বিষয়। কেবল সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে বর্তমানে মেয়াদ শেষ হওয়ায় সংসদ না থাকায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
পর্দার আড়ালের মূল ক্ষমতা কার?
পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শরণার্থীরা ঐতিহাসিক কারণে এই অধিকার ভোগ করে আসছেন। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বিক্ষোভকারীদের রাজপথের বদলে ভোটের মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে স্থানীয় প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুজাফফরাবাদের নির্বাচিত সরকারের হাতে বাস্তবিক কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এরশাদ মাহমুদের মতে, পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনী আজাদ কাশ্মীরের স্থানীয় নেতৃত্বকে কেবল ‘প্রতীকী’ পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করার মতো ক্ষমতা এই স্থানীয় নেতৃত্বের নেই।
ইতোমধ্যে আন্দোলনের অন্যতম নেতা উমর নাজির কাশ্মীরি প্রকাশ্যে জানান, তারা স্থানীয় সরকারের ওপর আস্থা হারিয়ে সরাসরি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের মতে, অঞ্চলের আসল ক্ষমতা ইসলামাবাদের হাতে নয়, বরং রাওয়ালপিন্ডির সামরিক দপ্তরের হাতেই রয়েছে।
সব মিলিয়ে শরণার্থী আসন ধরে রাখা ও আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসনের দ্বন্দ্বে ভোটের মাঠে চরম উত্তাপ বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষের বয়কট ও নিরাপত্তা বাহিনীর কড়াকড়ির মধ্যে এই নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

