ফৌজদারহাটে জলিল টেক্সটাইলে হবে অস্ত্রের কারখানা, হস্তান্তর ঘিরে শ্রমিকদের অসন্তোষ

ফৌজদারহাটে জলিল টেক্সটাইলে হবে অস্ত্রের কারখানা, হস্তান্তর ঘিরে শ্রমিকদের অসন্তোষ

চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে ২০০৪ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রয়াত্ত জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ৫৪.৯৯ একর জমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হস্তান্তর করা হয়েছে। মিলটির সব সম্পদও প্রতীকী মূল্যে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা (বিওএফ) এর সম্প্রসারণের জন্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর উপস্থিতিতে জমিটি চুক্তি সাক্ষরের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়। তবে এদিন দুপুরে এই হস্তান্তর ঘিরে দেখা দিয়েছে তীব্র শ্রমিক অসন্তোষ। প্রায় এগারো’শ শ্রমিক পাওনা আদায়ের দাবিতে মিলের বাইরে বিক্ষোভ করতে থাকে। তবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির শ্রমিকদের সাথে কথা না বলায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। তাদের অভিযোগ, ২০ কোটি ৫৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা তাদের পাওনা রয়েছে। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশনের (বিটিএমসি) কাছে দাবি জানিয়ে আসলেও এখনও পাওনা টাকা বুঝে পাননি শ্রমিকরা। শেষ পর্যন্ত মিলের জমি হস্তান্তর করে সেখানে অন্য প্রতিষ্ঠান করার প্রক্রিয়া চললেও পাওনা টাকার কোন সুরাহা হয়নি। অবিলম্বে এই দাবি পূরণ না হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, রেলপথ অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচী ঘোষণার হুশিয়ারি দেন তারা।

সূত্র জানায়, ১৯৬১ সালে জলিল চৌধুরীর উদ্যোগে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে প্রতিষ্ঠিত হয় জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে এটি জাতীয়করণ করা হয়। তখন থেকে এটি বিটিএমসির অধীনে ছিল। মিলটিতে ১২ হাজার ৪০০ স্পিন্ডলের আধুনিক স্পিনিং ইউনিট ছিল। মানসম্মত সুতা তৈরির জন্য মিলটির সুনাম ছিল দেশজুড়ে। তিনবার স্বর্ণপদকও পেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ১৯৮২ সালে মিলটিকে পুনরায় ব্যক্তি মালিকানায় নেয় তৎকালিন সরকার। লোকসান আর অব্যবস্থাপনায় মিলটি ২০০৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় ২০০৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় মালিকপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৬ মাসের মধ্যে মালিকপক্ষ মিল চালু না করলে হস্তান্তর চুক্তির ১৬ নম্বর শর্তানুযায়ী সরকার মিলটি অধিগ্রহণ করার ঘোষণা দেয়। মালিকপক্ষ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে ২০০৫ সালের ২০ নভেম্বর সরকারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মিলটি বন্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বিটিএমসির পক্ষ রায় হলে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি জলিল টেক্সটাইল মিলস পুনঃগ্রহণ করে সরকার এবং মিলটি বিটিএমসির নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করা হয়।

তবে ২০০৪ সালের পর থেকে ১০৭৫ জন শ্রমিকের গ্রাচুয়েটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বকেয়া বেতন, ওভারটাইম, লে-আউটসহ বিভিন্ন খাতের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। শ্রমিক নেতারা বলছেন, ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ২ এর ৪৯ ধারা-গ অনুসারে মিলের মালিক বলতে, সরকার কর্তৃক বা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বা পরিচালিত কোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এতদ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত কোন কর্তৃপক্ষ অথবা এইরূপ কোন কর্তৃপক্ষ না থাকিলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগীয় প্রধান মিলের মালিক। সেই হিসেবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিটিএমসির চেয়ারম্যান মিলের মালিক এবং তারা শ্রমিকের পাওনা পরিশোধে বাধ্য। তাছাড়াও আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত অনুসারেও মিলটি যদি টেকব্যাক করা হয় তাহলে পাওনা টাকার দায় সরকারের উপর বর্তায় বলে জানান শ্রমিক নেতারা। কিন্তু নানা তালবাহানায় দীর্ঘ দিন ধরে পাওনা দেওয়া হচ্ছে না। কেউ পাবেন তিন লাখ, কেউ পাবেন ৫ লাখ। কেউবা তারও বেশি। জীবনের শেষ ভরসা এই আর্থিক বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত প্রায় এগারো’শ শ্রমিক।

মিলটিতে ২০ বছর ধরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা জানে আলম বলেন, বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান সিরাজের নির্দেশে আমাদের পাওনা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অথচ বেসিক বেতন অনুসারে আমাদের পাওনা অনেক বেশি। আমরা চাই সরকারের নির্ধারণ করা টাকাও যেন আমাদের পরিশোধ করা হয়।

প্রাক্তন শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আজ অনেকগুলো বছর আমরা দাবিটি জানিয়ে আসছি। নানা জায়গা থেকে আশ্বাস পেলেও ন্যায্য টাকা আমরা হাতে পাচ্ছি না। অথচ মিলটি হস্তান্তর হয়ে গেল। একটি প্রতিষ্ঠানের জমিতে অন্য প্রতিষ্ঠান হতে পারে, তাতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু আমাদের পাওনা আমরা ফেরত চাই।

জলিল টেক্সটাইল মিলস সিবিএ সভাপতি মসিউদ্দৌলা বলেন, ২০১৩ সালে সরকার চার্টার্ড একাউন্টিং প্রতিষ্ঠান শফিক বসাক এণ্ড কোং দ্বারা অডিট করে জলিল টেক্সটাইলের ১০৭৫ শ্রমিকের পাওনা ২০ কোটি ৫৭ লাখ ৪৭ হাজার ৮০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সম্প্রতি আমরা অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর কাছে গেলে তিনিও বিটিএমসি’র চেয়ারম্যানকে বলেছিলেন এই টাকা সেনাবাহিনী সরকারকে দেবে তাহলে শ্রমিকদের পাওনা দিতে বাধা কোথায়। তিনি আরও বলেন, বিটিএমসির পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, আমাদের পাওনা আগের মালিক দেবেন। গত ২০ আগস্ট এবং ২৭ আগস্ট আমাদের এ বিষয়ে শুনানি করার কথা থাকলেও দুই দফায় সেটি পেছানো হয়। বৃহস্পতিবার জমি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে আমাদের নেওয়া হয়নি। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রীর একান্ত সচিব ফখরুল সাহেব দেখা করার আশ্বাস দিলেও কেউ আমাদের শুনেনি। আমরা মন্ত্রীর গাড়ির সামনে বিক্ষোভও করেছি। আমাদের পাওনার কোন সুরাহা হয়নি। আমরা এখন আত্মাহুতির পথ বেছে নিতে হবে। আমরা মহাসড়ক অবরোধসহ আরও কঠোর কর্মসূচী দিতে বাধ্য হব।

এদিকে বৃহস্পতিবার জলিল টেক্সটাইল মিলের ৫৪.৯৯ শতাংশ জমি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। হস্তান্তর চুক্তি সাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির, প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টাসহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির বলেন, বর্তমান বিশ্বের প্রতিরক্ষা শিল্প প্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। এখন অনেক অনেক কম মূল্যে ড্রোনসহ নানা সমরাস্ত্রের ভালো চাহিদা রয়েছে। সরকার অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে সব ধরণের সহযোগিতা করবে। এটি দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

সেনাপ্রধান বলেন, দেশের সমরাস্ত্র শিল্পকে রপ্তানিমুখী করতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশে বাংলাদেশের সমরাস্ত্রে চাহিদা রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর হলে অস্ত্র রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো ও সমরাস্ত্র উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যেই জলিল টেক্সটাইলের জমি ব্যবহার করা হবে। সেখানে আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের পরিধি বাড়াতে উচ্চ-প্রযুক্তির উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সামরিক লজিস্টিকস ও সংবেদনশীল সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো ও বিশেষায়িত সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন