মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ কী

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ কী

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর লক্ষ্য ছিল হুমকি প্রতিরোধ, আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা প্রদান এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজের শক্তির জানান দেওয়া। কিন্তু এসব ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে আলোচনা থমকে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এখন ওই অঞ্চলে তাদের ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা করছে। ইরানের হামলায় ঘাঁটিগুলো ক্ষতিপ্রস্ত হওয়ার পর পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করছে। তারা কমসংখ্যক সেনা মোতায়েন বা বাহিনীকে পশ্চিম দিকে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে পর্যালোচনার বিষয়টি শুধু লজিস্টিকস বা অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ এটি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নীতির ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যেও পরিবর্তন আনতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চল ও এর আশপাশে অন্তত ২০টি ঘাঁটিতে প্রায় ৫০,০০০ সৈন্য মোতায়েন রেখেছে। প্রধান ঘাঁটিগুলোর মধ্যে আছে কাতারের আল-উদেইদ, বাহরাইনের এনএসএ, কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান ও ক্যাম্প বুহরিং, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি। সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের হামলায় অন্তত ১৫টি মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে আছে কাতারের আল-উদেইদে রাডার ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, বাহরাইনে নৌসদর দপ্তর, গুদাম ও যোগাযোগ অবকাঠামো এবং কুয়েতে বিমান, লজিস্টিকস ও সহায়তা কেন্দ্র।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিব্যবস্থার প্রতিরোধ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। এসব ঘাঁটির উপস্থিতি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের আক্রমণ থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি, বরং মার্কিন থাকায় এই দেশগুলো ইরানের পাল্টা আক্রমণের শিকার হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় গড়ে তোলা সমন্বিত আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্ভবত ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি রোধ করতে সক্ষম হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষস্থানীয় থিংক ট্যাংক রাবদান সিকিউরিটি অ্যান্ড ডিফেন্স ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টিয়ান আলেকজান্ডার সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরবকে বলেছেন, ‘ইরানের পাল্টা আক্রমণ প্রথাগত প্রতিরোধ কৌশলের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে। এই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করতে হলে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে সুরক্ষিত অবকাঠামো, বহু-স্তরের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিকল্প বা অতিরিক্ত সক্ষমতা এবং মার্কিন বাহিনী কখন কীভাবে স্বাগতিক দেশগুলোকে রক্ষা করবে, সে বিষয়ে আরো স্পষ্ট রাজনৈতিক বোঝাপড়া।’

ইরানের আক্রমণের শিকার মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ ট্রাম্পের গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য আর ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ কৌশলগত অগ্রাধিকার নয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সহযোগী ফেলো এফ. গ্রেগরি গস বলেছেন, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে এসব দেশ দীর্ঘদিন ধরে তাদের সুরক্ষায় ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ হিসেবে দেখেছে। এখন এগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলে তা এমন সংকেত দেবে যে, যুক্তরাষ্ট্র আর তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো ‘ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বিষয়টি দ্রুতই পুনর্বিবেচনা করবে।’

এদিকে, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের যৌথ প্রতিরক্ষার মাধ্যমে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের চেষ্টাও করছে। এর মধ্যে আছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসির সমন্বিত সামরিক কমান্ড, যৌথ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং যৌথ সামরিক মহড়া। পাশাপাশি তুরস্ক, ইউরোপ, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরব ও তুরস্কের সাম্প্রতিক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র মতো প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। কিন্তু মার্কিন সামরিক ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোর ওপর তাদের অধিক নির্ভরতার কারণে স্বল্প মেয়াদে এসব পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের ভূমিকাকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।

মার্কিন সামরিক উপস্থিতি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে

কোন কোন বিশেষজ্ঞ উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমার বিষয়টিকে সাময়িক এবং পরিবর্তনযোগ্য বলে মনে করেন। চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো আহমেদ আবুদুহ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত শেষ হলেও এই ঘাঁটিগুলোর অস্তিত্ব থাকবে।’ অন্যদিকে, ‘নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি’র প্রোগ্রামের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ডানিয়া আরায়েসি বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে এই অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্রমেই স্বাধীন হয়ে উঠছে। কিন্তু তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকবে, তবে তা সরাসরি স্থলভাগে সেনা মোতায়েনের পরিবর্তে সামরিক প্রশিক্ষণ, অংশীদারত্ব এবং ওই অঞ্চলের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নজর দেবে।’

উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের সামরিক জোট শক্তিশালী ও অস্ত্র সংগ্রহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমে আসার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের সঙ্গেও সমঝোতা করতে পারে। আহমেদ আবুদুহ বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনার ক্ষেত্রে চীন সহায়তা করতে পারে, যেমনটি তারা ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের মধ্যস্থতা করার সময় করেছিল। যদিও পাকিস্তান, ওমান, ইরাক বা কাতারের মতো দেশগুলো মূল মধ্যস্থতার দায়িত্ব পালন করতে পারে। তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামোয় ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন হবে।’

বিশ্লেষক ডানিয়া আরায়েসির মতে, ‘হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে মক্কা চুক্তির মতো বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার যে চেষ্টা উপসাগরীয় দেশগুলো চালাচ্ছে, তা ইরানের অর্থনীতি ও প্রভাবকে দুর্বল করবে। তিনি মনে করেন, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান দেশগুলোর, বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আস্থা হারিয়েছে যা আর ফিরে আসবে না।’

তবে, ক্রিস্টিয়ান আলেকজান্ডারের মতে, ‘ওয়াশিংটন যে ধরনের গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিকস, নৌ ও বিমান শক্তি, কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল এবং বিশ্বজুড়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতার সমন্বয় প্রদান করে, তার কোনোটিই বর্তমানে অন্য কোনো দেশ দিতে পারে না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ বা তার বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারে, এমন কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেই।’ তাছাড়া, এই ঘাটতি পূরণে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলা বা বিকল্প অংশীদারত্ব তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কমে গেলে ইসরাইল আরো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে এবং এ অঞ্চলের দেশগুলো এর বিপরীতে নিজেদের সুরক্ষার কৌশল বেছে নেবে। এই পরিবর্তনের ফলে তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরো বাড়বে, বিশেষ করে সিরিয়া ইস্যুতে। কারণ আঙ্কারা সেখানে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে এবং ইসরাইল সেখানে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে শঙ্কিত। তবে ‘আব্রাহাম চুক্তি’র কারণে ইসরাইলের এই কঠোর অবস্থানের প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর তুলনামূলকভাবে কম পড়বে।

ইরানের বিষয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশল নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির নিয়ে তাদের আস্থার মাত্রার ওপর। যুদ্ধের ফল যা-ই হোক না কেন, উপসাগরীয় দেশগুলো তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ওপর আস্থা থাকলে তারা ইরানের প্রতি কম নমনীয় হবে। অন্যদিকে, তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ থাকলে তারা ইরানকে অনেক ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে।

ক্রিস্টিয়ান আলেকজান্ডার বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ও স্থায়ী ঘাঁটির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হতে পারে একটি ‘বিকেন্দ্রীভূত প্রবেশাধিকার’ মডেল। এই মডেলে পর্যায়ক্রমিক সেনা মোতায়েন, আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মজুত রাখা, যৌথ সুবিধা ব্যবহার, নৌশক্তির প্রয়োগ এবং বিভিন্ন স্থানে অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সমন্বিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার, প্রতিরোধ ক্ষমতা, যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখা সম্ভব হবে।

দ্য নিউ আরব অবলম্বনে মোতা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন