কোমর থেকে পায়ের ব্যথা

কোমর থেকে পায়ের ব্যথা

কোমরব্যথা থেকে পায়ের দিকে এ রকম ব্যথায় ভুগছেন? কোমর থেকে নিতম্ব, ঊরু হয়ে পায়ের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া শুধু সাধারণ কোমরব্যথা নয়; অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে স্নায়ু, মেরুদণ্ডের ডিস্ক বা পেশির সমস্যাও জড়িত থাকতে পারে। ব্যথার ধরন, অবস্থান ও অন্য উপসর্গের ওপর নির্ভর করে কারণও ভিন্ন হয়। তাই দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র ব্যথাকে অবহেলা না করে কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। বিস্তারিত লিখেছেন ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ।

কোমর থেকে ব্যথা কেন পায়ে যায়

বিজ্ঞাপন

কোমরের নিচের অংশ থেকে পায়ের দিকে গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু চলে গেছে। এসব স্নায়ুতে চাপ বা জ্বালা তৈরি হলে ব্যথা তার পথ ধরে নিতম্ব ও পায়ের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে।

প্রধান কারণগুলো হলো—

* সায়াটিক নার্ভে চাপ বা প্রদাহ

* মেরুদণ্ডের ডিস্কের সমস্যা

*কোমরের পেশিতে টান

* মেরুদণ্ডের বয়সজনিত ক্ষয়

* স্পাইনাল স্টেনোসিস

* দীর্ঘ সময় ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকা

* ভারী জিনিস ভুলভাবে তোলা

* দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো

* শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা

* অতিরিক্ত ওজন

* কোমর বা মেরুদণ্ডে আঘাত

সায়াটিকা কী

কোমর থেকে নিতম্ব হয়ে এক পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়া ব্যথাকে অনেক সময় সায়াটিকা বলা হয়। এর সঙ্গে পায়ে ঝিনঝিন, অবশভাব, জ্বালাপোড়া বা দুর্বলতাও থাকতে পারে। তবে কোমর থেকে পায়ে ব্যথা হলেই সেটি সায়াটিকা—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। চিকিৎসকের মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।

প্রধান লক্ষণ

এ ধরনের সমস্যায় নিচের উপসর্গ দেখা দিতে পারে—

* কোমরে ব্যথা বা শক্তভাব

* নিতম্বে ব্যথা

* ঊরু ও পায়ের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া

* পায়ে ঝিনঝিন করা

* অবশ বা অসাড় অনুভূতি

* জ্বালাপোড়া

* বিদ্যুৎ চলার মতো ব্যথা

* পায়ের পেশিতে দুর্বলতা

* হাঁটতে অস্বস্তি

* দীর্ঘ সময় বসে থাকলে ব্যথা বাড়া

* কাশি বা হাঁচির সময় ব্যথা বেড়ে যাওয়া

ব্যথার প্রকারভেদ

তীব্র বা আকস্মিক ব্যথা : হঠাৎ ভারী জিনিস তোলা, পড়ে যাওয়া বা পেশিতে টান লাগার পর শুরু হতে পারে।

উপতীব্র ব্যথা : কয়েক সপ্তাহ ধরে স্থায়ী থাকতে পারে এবং ধীরে ধীরে কমতে বা বাড়তে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা : দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা বা বারবার ফিরে আসা ব্যথা দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

WHO কোমর ব্যথাকে সাধারণভাবে তীব্র, উপতীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী—এই সময়কালভিত্তিক শ্রেণিতে বিবেচনা করে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

* দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা

* একটানা গাড়ি চালানো

* নিয়মিত ভারী শ্রম করা

* ভুল অঙ্গভঙ্গি

* ব্যায়ামের অভাব

* অতিরিক্ত ওজন

* বয়স বৃদ্ধি

* আগে কোমরব্যথা থাকা

* ধূমপান

* কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় শারীরিক চাপ থাকা। গবেষণায় কর্মক্ষেত্রের কিছু ঝুঁকি, ধূমপান ও অতিরিক্ত BMI-কে কোমরব্যথাজনিত অক্ষমতার বোঝার সঙ্গে যুক্ত পাওয়া গেছে।

কোন বয়সে বেশি দেখা যায়

কোমরব্যথা যেকোনো বয়সে হতে পারে। তবে WHO-এর তথ্য অনুযায়ী বয়স বাড়ার সঙ্গে এর প্রকোপ বাড়ে এবং ৫০-৫৫ বছর বয়সে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে ব্যথাজনিত অক্ষমতার প্রভাবও বেশি হতে পারে।

কখন দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন

* পায়ের দুর্বলতা দ্রুত বাড়ছে

* দুই পায়ে তীব্র অবশভাব

* যৌনাঙ্গ বা ঊরুর ভেতরের অংশ অসাড় হয়ে যাচ্ছে

* প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে নতুন সমস্যা হয়েছে

* গুরুতর আঘাতের পর ব্যথা শুরু হয়েছে

* জ্বরের সঙ্গে তীব্র কোমরব্যথা হচ্ছে

* ব্যথা ক্রমশ বাড়ছে

* দীর্ঘদিনেও ব্যথা কমছে না

রোগ নির্ণয়ে কী করা হয়

চিকিৎসক প্রথমে ব্যথার স্থান, সময়কাল, তীব্রতা এবং পায়ে ছড়িয়ে পড়ার ধরন জানতে চান। এরপর শারীরিক পরীক্ষা করে পেশির শক্তি, অনুভূতি ও স্নায়ুর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হতে পারে। সব রোগীর জন্য এক্স-রে বা এমআরআই প্রয়োজন হয় না। উপসর্গ ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে এসব পরীক্ষা করা হয়।

প্রতিরোধে করণীয়

কোমরের সুস্থতা ধরে রাখতে—

v দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকবেন না

v নিয়মিত বিরতি নিয়ে হাঁটাচলা করুন

v ভারী জিনিস তোলার সময় সতর্ক থাকুন

v দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারে ঝুঁকে থাকা এড়িয়ে চলুন

v বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন

v স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন

v কর্মক্ষেত্রে সঠিক অঙ্গভঙ্গি বজায় রাখুন

v দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন

চিকিৎসায় কী গুরুত্বপূর্ণ

সব ধরনের কোমরব্যথার চিকিৎসা এক নয়। কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। দীর্ঘস্থায়ী প্রাথমিক কোমরব্যথার ক্ষেত্রে রোগীকে স্বাস্থ্যশিক্ষা, শারীরিক কার্যক্রম, উপযুক্ত ব্যায়াম ও প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসনভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে পায়ে অবশভাব বা দুর্বলতা থাকলে কারণ নির্ণয় জরুরি।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন