বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)

প্লেগ গবেষণাগারে সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনায় তথ্য গোপন করছে রাশিয়া

প্লেগ গবেষণাগারে সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনায় তথ্য গোপন করছে রাশিয়া

রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে প্লেগ গবেষণাগারের এক কর্মীর সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনায় এখনো পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য পায়নি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রেয়েসুস বলেছেন, রাশিয়ার কাছ থেকে পর্যাপ্ত ও স্বচ্ছ তথ্য না পাওয়ায় ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ ঝুঁকি মূল্যায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

বুধবার এক বক্তব্যে তেদরোস বলেন, ‘আমরা এখনো এই ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাইনি এবং পূর্ণাঙ্গ ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারছি না।’ তিনি বলেন, পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন তথ্যের ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি সঠিকভাবে নিরূপণের জন্য সময়মতো পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তথ্য বিনিময় জরুরি।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার সূত্রপাত সাইবেরিয়ার ইরকুতস্ক অঞ্চলে। সেখানে একটি প্লেগ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী এক নারী কর্মী ২ অক্টোবর মারা যান। রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি অজ্ঞাত কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, তিনি নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। এখন পর্যন্ত রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই নারীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং কোন জীবাণু তার অসুস্থতার জন্য দায়ী ছিল, সে বিষয়ে তারা এখনো নিশ্চিত নন। ডব্লিউএইচওর মহামারি ও মহামারি ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মারিয়া ভ্যান কারখোভ বলেছেন, সংস্থাটি এখনো জানে না কীভাবে ওই নারী সংক্রমিত হয়েছিলেন এবং কোন জীবাণু তার মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল। এজন্য রাশিয়ার কাছ থেকে আরো তথ্য চাওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানের আরো একজন কর্মীর অজ্ঞাত কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তেদরোস জানিয়েছেন, এ বিষয়ে রাশিয়ার সরকারের কাছ থেকেও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো তথ্যই তারা উপেক্ষা করতে পারেন না এবং দ্বিতীয় কর্মীর অসুস্থতার বিষয়টি যাচাই করতে রাশিয়ার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে।

তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে দ্বিতীয় সন্দেহজনক রোগীর খবরকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘ভুয়া তথ্য’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্যের জন্য রাশিয়ার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা রসপোট্রেবনাদজরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা উচিত। রুশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, মৃত কর্মীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পরীক্ষায় বিপজ্জনক কোনো রোগজীবাণু পাওয়া যায়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, মৃত কর্মীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে অসুস্থতার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি বলে রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংস্থাটি এর আগে জানিয়েছিল, ইরকুতস্ক অঞ্চলের জন্য জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মাঝারি থেকে কম, পুরো রাশিয়ার জন্য ঝুঁকি কম এবং ইউরোপীয় অঞ্চলের জন্য ঝুঁকি খুবই কম।

ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোলও (ইসিডিসি) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি বা মানুষের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নিউমোনিক প্লেগ গুরুতর রোগ হলেও অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে এর চিকিৎসা সম্ভব এবং সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘ সময়ের সংস্পর্শে এলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

নিউমোনিক প্লেগ এবং বুবোনিক প্লেগ একই ব্যাকটেরিয়া—ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস—থেকে সৃষ্টি হয়। নিউমোনিক প্লেগ ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্রের কণার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ছড়াতে পারে। চিকিৎসা না হলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। তবে দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দেওয়া হলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মূল কারণ এখনো রোগটি নিশ্চিত হওয়া নয়, বরং তথ্যের ঘাটতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, রাশিয়ার কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ এবং সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, আল-জাজিরা ও ইউএনওজি নিউজরুম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...