গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবিতে শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ করবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। রাজধানীর শাপলা চত্বরে সকাল ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত জনসভা শেষে প্রায় দেড় হাজার গাড়ির বহর নিয়ে শুরু হবে এই লংমার্চ। পর্যায়ক্রমে চারটি পথসভা শেষে সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে জনসভার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই কর্মসূচি। লংমার্চে নেতৃত্ব ও সভাগুলোতে বক্তব্য দেবেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষনেতারা।
এই কর্মসূচি সফলের জন্য ১১ দলের কেন্দ্রীয় বাস্তবায়ন কমিটি ছাড়াও রুট সংশ্লিষ্ট ৯টি শাখা প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় গতকালও রাজধানীসহ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে গণসংযোগ ও প্রচার মিছিল করেছেন জামায়াতসহ ১১ দলের নেতাকর্মীরা।
এদিকে বর্তমান সংসদের বিরোধী দলের সর্ববৃহৎ এই কর্মসূচি সফলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে জনগণের আস্থায় থাকার জন্য সরকার, সরকারি দল ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জোটটি। যদি সরকারে থাকা কোনো দল বা কেউ লংমার্চে কোনো প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে তাহলে তারা জনগণের আস্থা আরো হারানোর পাশাপাশি জনরোষের মুখোমুখি হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে লংমার্চের সর্বশেষ প্রস্তুতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এই হুঁশিয়ারি দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এর আগে সেখানে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষনেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী শান্তিপূর্ণ লংমার্চ সফল করার জন্য ১১ দলীয় ঐক্যের সর্বশেষ প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর বিরোধী দল জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে সংসদের ভেতরে ও বাইরে এখনো নিয়মতান্ত্রিক, গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধÑবিরোধী দলের সর্ববৃহৎ শান্তিপূর্ণ এই রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সফল করতে সব প্রশাসনিক সহযোগিতা দিয়ে সরকার জনগণের আস্থায় থাকবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সরকারের কোনো দল বা কেউ লংমার্চে কোনো প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে তাহলে তারা তো জনগণের আস্থা হারাচ্ছে, আরো হারাবে এবং জনরোষের মুখোমুখি হবে। আশা করি এ রকম কোনো অপরিণামদর্শী পথে সরকার ও সরকারি দলের কেউ পা বাড়াবে না।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার গঠনের ছয় মাস পার হলেও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে তারা উদ্যোগ নেয়নি। বরং গণরায় বাস্তবায়ন করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে আমাদের স্পষ্ট কথা হচ্ছে, গণভোটের গণরায়ে কোনো নোট অব ডিসেন্ট নেই। গণভোটে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট খারিজ হয়েছে। আমরা জুলাই বিপ্লবের রক্তের বিনিময়ে একসঙ্গে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। আমরা সরকার উৎখাতের কোনো আন্দোলন করছি না, জনগণের ও আমাদের দাবি হলো, গণভোটের গণরায়কে আপনারা মেনে নেন। বিরোধীদলের রাজনীতি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমাদের ছয় দফা আপনারা মেনে নিন। আমরা প্রত্যাশা করি, আমাদের কর্মসূচিকে সম্মান দেখিয়ে সরকার জনগণের আস্থায় থাকবে।
তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে প্রমাণিত হোক বিরোধী দল ও সরকারি দলের পরমত সহিষ্ণুতা রয়েছে এবং আমরা রাজনৈতিক সহিংসতার নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, পুলিশ প্রশাসনের মহাপরিদর্শককে ১১ দল লিখিতভাবে কর্মসূচির বিষয়ে অবহিত করেছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ডিসি-এসপিকেও লিখিতভাবে অবগত করা হয়েছে। রাস্তার দুই ধারে হাজার হাজার জনগণ লংমার্চকে অভিবাদন জানাবে।
তিনি বলেন, লংমার্চের সামগ্রিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে ইতোমধ্যে। লংমার্চের বহরে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হবে বলে আমরা ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি। এর উদ্বোধনী সমাবেশ সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে। লংমার্চের রুটে পূর্বনির্ধারিত বিভিন্ন পয়েন্টে পথসভা হবে। প্রথমটি নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজের কাছে ট্রাকস্ট্যান্ডে, পর্যায়ক্রমে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল ও চট্টগ্রামের মিরসরাই এবং সবশেষে রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে জনতার ঢল নামবে বলে খবর পাচ্ছি।
জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল জানান, লংমার্চে অংশগ্রহণকারী ডেলিগেটরা গাড়ি থেকে নেমে পথসভায় যোগ দেবেন না। পথসভা স্থানীয় শাখা বাস্তবায়ন করবে। বহরে থাকা গাড়িতে স্টিকার থাকবে এবং চলমান থাকা অবস্থায় কোনো গাড়ি বহরে যুক্ত হলে শেষ দিকে হবে। এতে গণমাধ্যম, আইটি, শীর্ষ নেতা, অ্যাম্বুলেন্স, সাংস্কৃতিক, মেডিকেল ও সিকিউরিটি টিমের গাড়ি সিরিয়ালি থাকবে। গাড়িতে নিজ দায়িত্বে খাবার ব্যবস্থা করতে হবে।
এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের ছয় মাসে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ অনেক কিছু করার সময় ছিল। কিন্তু তা না করায় নৃশংসতা-বর্বরতা বেড়েছে, অপরাধীরা জামিন পাচ্ছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাস্তায় গাড়ি তো চলছেই, গাড়ি বন্ধ করে তো তেল সংকটের সমাধান হবে না।
প্রশ্নের জবাবে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, লংমার্চে আমরা কোনো নাশকতার আশঙ্কা করছি না। আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি, আর ঐক্যবদ্ধ থাকলে শয়তান ভয় পায়। তবে কেউ কোনো কিছু করলে তার দায় সরকারকে নিতে হবে। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকায় আসা মানুষের কাছে যাওয়ার সুযোগ হওয়ায় এই লংমার্চকে আমরা আনন্দ হিসেবে নিচ্ছি। তিনি দুর্নীতিবাজ ও বিতর্কিত মন্ত্রীদের থামাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংস্কার করতেই হবে।
বৈঠকে ও প্রেস ব্রিফিংয়ে আরো উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসাইন মিয়াজী, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন ও মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি ও উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন প্রমুখ।
সূত্রমতে, গত ৬ আগস্ট বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে ১১ দলের অবস্থান কর্মসূচি থেকে ঢাকায় মহাসমাবেশসহ চার বিভাগে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শনিবার প্রথম লংমার্চ হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে। পর্যায়ক্রমে ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা-কুষ্টিয়া, এবং ২১ নভেম্বর ট্রেনযোগে সিলেট মহানগর অভিমুখে লংমার্চ পালিত হবে। সবশেষে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে ঢাকায় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।
ছয় দফা দাবির মধ্যে আরো রয়েছেÑজুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
শাপলা চত্বরে এনসিপি নেতারা
এদিকে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকারসহ এনসিপির শীর্ষ নেতারা শুক্রবার রাত ১০টায় রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে লংমার্চের সূচনা সভাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি কামনা করেন।
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


