দুই মহাদেশের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে ইস্তাম্বুল বহু শতাব্দী ধরেই বৈশ্বিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একসময় সিল্ক রোড ও কৃষ্ণসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত নৌপথ নিয়ন্ত্রণের কারণে বাইজেন্টিয়াম ও পরে কনস্টান্টিনোপল হিসেবে শহরটির গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। রেলপথের যুগে বিখ্যাত ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসেরও শেষ গন্তব্য ছিল এই শহর।
একবিংশ শতাব্দীতে সেই ঐতিহাসিক সংযোগের নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে আকাশপথে। তুরস্কের আইজিএ ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভালো যোগাযোগ-ব্যবস্থা সম্পন্ন বিমানবন্দর হিসেবে লন্ডনের হিথ্রোকে পেছনে ফেলেছে।
বৈশ্বিক ভ্রমণ তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওএজির ২০২৬ সালের ‘মেগাহাবস ইনডেক্স’-এ শীর্ষস্থান দখল করেছে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর। বিশ্বের বড় বিমানবন্দরগুলোর আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের নির্ধারিত সংযোগ এবং সেখান থেকে পৌঁছানো যায় এমন গন্তব্যের সংখ্যা তুলনা করে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এ বছরের ব্যস্ততম দিনের তথ্য হিসেবে ২ আগস্টের কার্যক্রম বিবেচনায় নেওয়া হয়।
ওএজির প্রধান বিশ্লেষক জন গ্রান্ট বলেন, ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর শেষ পর্যন্ত বিশ্বের এক নম্বর অবস্থান অর্জন করেছে। তার মতে, আগামী বছরগুলোতে বিমানবন্দরটির অবস্থান আরো শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আইজিএ ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলাহাত্তিন বিলগেন বলেন, বিশ্বের শীর্ষ সংযুক্ত বিমানবন্দর হওয়া তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বর্তমানে বিমানবন্দরটি বিশ্বের প্রায় ৩৫০টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে এবং আরো সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
২০২৬ সালের তালিকায় ইস্তাম্বুলের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লন্ডন হিথ্রো। তৃতীয় আমস্টারডাম শিফল, চতুর্থ কুয়ালালামপুর এবং পঞ্চম শিকাগো ওহেয়ার বিমানবন্দর। ২০১৮ সালে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয় অংশে চালু হয় বিমানবন্দরটি। শহর থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে নির্মিত এই বিশাল স্থাপনা শুরু থেকেই বড় পরিসরে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়। বিমানবন্দরটির টার্মিনালের আয়তন প্রায় ১৪ লাখ বর্গমিটার, যা এক ছাদের নিচে বিশ্বের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল। পুরো বিমানবন্দর এলাকার আয়তন প্রায় ৭ কোটি ৬৫ লাখ বর্গমিটার—অর্থাৎ নিউইয়র্কের ম্যানহাটন দ্বীপের চেয়েও বড়।
প্রতি বছর ৮ কোটি ৪০ লাখের বেশি যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। বর্তমানে এটি বিশ্বের অষ্টম ব্যস্ততম বিমানবন্দর। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যাত্রী ধারণক্ষমতা বছরে ২০ কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এই সংখ্যা বিশ্বের বর্তমান ব্যস্ততম বিমানবন্দর আটলান্টার হার্টসফিল্ড-জ্যাকসনের বার্ষিক যাত্রীসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। বিমানবন্দরটির সম্প্রসারণ পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রানওয়ে। সম্প্রতি এর চতুর্থ প্রধান রানওয়ে চালু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছয়টি প্রধান ও তিনটি রিজার্ভ—মোট নয়টি রানওয়ে তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন রানওয়েটির দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৮২০ মিটার এবং এটিই বিমানবন্দরটির প্রথম পূর্ব-পশ্চিমমুখী রানওয়ে। এর ফলে পশ্চিমমুখী উড়োজাহাজের ট্যাক্সি ও আকাশপথের সময় কমবে, একই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয় হবে।

ওএজির বিশ্লেষক গ্রান্টের মতে, একই সময়ে তিনটি রানওয়ে ব্যবহারের অনুমোদন থাকা বিশ্বের একমাত্র বিমানবন্দর ইস্তাম্বুল। এর ফলে ব্যস্ত সময়ে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালনায় বাড়তি নমনীয়তা পাওয়া যায় এবং সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়ে।
এই বিমানবন্দরের সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে টার্কিশ এয়ারলাইনসের। ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের প্রায় ৮০ শতাংশ ফ্লাইটই এই বিমান সংস্থার। ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বের অন্য যেকোনো এয়ারলাইনসের তুলনায় সবচেয়ে বেশি—১৩০টি দেশে—ফ্লাইট পরিচালনার রেকর্ডও রয়েছে তাদের। টার্কিশ এয়ারলাইনসের বহরে ৫০০টির বেশি বোয়িং ও এয়ারবাস উড়োজাহাজ রয়েছে। আধুনিক ও তুলনামূলক নতুন উড়োজাহাজ ব্যবহারের ফলে যাত্রীসেবার মান বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি খরচও কমে। ফলে উচ্চ জ্বালানি মূল্যের সময়ে টিকিটের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখার সুযোগ পায় সংস্থাটি।
ব্রিটেনের ক্র্যানফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এয়ার ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ভিক্টোরিয়া মাইরোনিউক বলেন, আধুনিক উড়োজাহাজ যাত্রীদের কাছে ভালো অভিজ্ঞতা তৈরি করে। টার্কিশ এয়ারলাইনস সম্প্রতি ইউরোপের সেরা এয়ারলাইনসের পুরস্কারও পেয়েছে।
ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের অবস্থান ও অবকাঠামোও এর সংযোগ সক্ষমতাকে বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও বিমান চলাচল নেটওয়ার্কে পরিবর্তন এসেছে। এই পরিস্থিতিতে তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইস্তাম্বুলকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
লন্ডন হিথ্রোর তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে আমস্টারডাম শিফল বছরে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ফ্লাইট চলাচলের সীমার মধ্যে রয়েছে। ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর শহরের কিছুটা বাইরে হওয়ায় সেখানে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।

টার্কিশ এয়ারলাইনসের ‘স্টপওভার’ কর্মসূচিও বিমানবন্দরটির আকর্ষণ বাড়িয়েছে। দীর্ঘ ট্রানজিটের যাত্রীরা চাইলে ইস্তাম্বুলে অবস্থান করে শহর ঘুরে দেখতে পারেন এবং বিশেষ ক্ষেত্রে হোটেলে বিনামূল্যে থাকার সুবিধাও পান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা যাত্রীদের দ্রুত সংযোগ বদলের বদলে স্থানীয় সংস্কৃতি ও শহরকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়। ফলে বিমানবন্দরটি শুধু ট্রানজিট কেন্দ্র নয়, পর্যটনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারে পরিণত হচ্ছে।
আগামী বছরগুলোতে ইস্তাম্বুলের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন ওএজির গ্রান্ট। তবে তিনি মনে করেন, আগামী তিন থেকে চার বছরে চীনের বিমানবন্দরগুলোও আন্তর্জাতিক সংযোগের ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। চীনা এয়ারলাইনসগুলোর আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ বাড়লে দেশটির বড় বিমানবন্দরগুলোও মেগাহাব তালিকায় আরো ওপরে উঠতে পারে।
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচল স্বাভাবিক হলে ওই অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোও আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তবে ইউরোপের হিথ্রো, শিফল ও প্যারিসের মতো বড় বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতা সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় ইস্তাম্বুলের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বজায় রাখার সুযোগ থাকছে।
সূত্র: সিএনএন
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


