কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ : দূরদূরান্তের মুসলিম এলাকার প্রশাসনিক ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে খলিফা যোগ্যতম এবং সৎ ব্যক্তিদের আমিল (প্রশাসক) পদে নিয়োগ দিতেন এবং তাদের কর্মকাণ্ডে কড়া নজর রাখতেন। রাজদরবারে বা বিচারালয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশে কোনো বাধানিষেধ ছিল না। সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কোষাগার রক্ষণাবেক্ষণকারীদের তিনি যেমন পুরস্কৃত করতেন, তেমনি কোনো কর্মকর্তা বা গভর্নরের বিরুদ্ধে সামান্যতম দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পেলে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতেন।
এই অভূতপূর্ব প্রশাসনিক নজরদারি ও জবাবদিহিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে খলিফা ওমর (রা.) খেলাফতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম স্বাধীন ও উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় তদন্ত সেল বা গোয়েন্দা বিভাগ গঠন করেন। এর প্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.)-কে দায়িত্ব দেন। দূরদূরান্তের কোনো গভর্নর বা সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রজাদের পক্ষ থেকে আর্থিক অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সামান্যতম অভিযোগ আসা মাত্রই খলিফা তাকে ঘটনাস্থলে পাঠাতেন। কুফার বিখ্যাত গভর্নর ও পারস্য বিজয়ী সেনাপতি সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) যখন নিরাপত্তার জন্য সরকারি প্রাসাদে বিশাল ফটক বা দরজা নির্মাণ করেছিলেন, তখন খলিফার নির্দেশে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) কুফায় গিয়ে জনসমক্ষে সেই ফটকটি পুড়িয়ে ছাই করে দেন এবং সাধারণ নাগরিক ও বিচারপ্রার্থীদের প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত করে দেন। এই কঠোর ও পক্ষপাতহীন তদন্ত ব্যবস্থার ফলেই বিপুল ক্ষমতার অধিকারী প্রাদেশিক গভর্নররাও বাইতুল মালের অর্থ ব্যয় এবং ক্ষমতার ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতেন।
মুদ্রাব্যবস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা : খেলাফতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক লেনদেনকে সহজ, স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল করতে খলিফা ওমর (রা.) মুদ্রাব্যবস্থায় যুগান্তকারী সংস্কার আনেন। তিনি দিরহামের ওজন ও মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করেন। বাজারে মুদ্রার শুদ্ধতা বজায় রাখা, জাল মুদ্রা তৈরি রোধ করা এবং বাজারে ওজন ও পরিমাপের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিয়োজিত ছিল। ফলে অর্থনৈতিক লেনদেন আরো গতিশীল এবং মুদ্রার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছিল।
চামড়ার মুদ্রা প্রবর্তনের উদ্যোগ ও দূরদর্শী মুদ্রানীতি : খলিফা ওমর (রা.)-এর মুদ্রা সংস্কার শুধু সোনা-রুপার ওজনের প্রমিতকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি খেলাফত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ খুচরা বাজারকে গতিশীল করতে এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক ছোটখাটো ও সস্তা কেনাকাটাকে সহজ করতে এবং বাজারে ধাতব মুদ্রার ঘাটতি মেটাতে তিনি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উটের চামড়া দিয়ে এক ধরনের প্রতীকী মুদ্রা বা টোকেন কারেন্সি (Token Currency) চালুর দূরদর্শী পরিকল্পনা করেছিলেন। যদিও পরে মুদ্রাস্ফীতি এবং চামড়ার অতিরিক্ত অপব্যবহারের আশঙ্কায় সাহাবিদের পরামর্শে তিনি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন, তবু বাজারে কৃত্রিম অর্থনৈতিক মন্দা রোধে তার এই চিন্তা সমকালীন বিশ্ব অর্থনীতিতে কাগজের মুদ্রা বা ফিয়াট মানির (Fiat Money) আদি রূপ হিসেবে গবেষকদের কাছে এক পরম বিস্ময়।
এছাড়া রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি রোম ও পারস্য অঞ্চলের অস্থিতিশীল স্বর্ণ-রৌপ্যের বাজারদর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে মদিনার বাজারে ধাতব মুদ্রার তারল্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।
রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের খাত ও সুষম বণ্টন : বাইতুল মালে অর্জিত বিশাল রাজস্ব কোনো ব্যক্তি বা শাসকের খেয়ালখুশিমতো ব্যয়ের সুযোগ ছিল না। বরং তা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সুষম নীতি অনুসারে ব্যয় হতো। এই রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রধান প্রধান খাতগুলো ছিল—
ক. দরিদ্র, এতিম, বিধবা ও অসহায় নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা প্রদান;
খ. স্থায়ী সেনাবাহিনীর বেতন-ভাতা;
গ. যুদ্ধের ঘোড়া ও উন্নত অস্ত্র উৎপাদন;
ঘ. প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উচ্চ অঙ্কের বেতন প্রদান (যেন কেউ অভাবের কারণে দুর্নীতি না করে) এবং
ঙ. জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো যেমন নতুন রাস্তাঘাট, সেতু, মুসাফিরখানা ও কৃষিকাজের সুবিধার্থে নতুন সেচ খাল খনন করা।
জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো নির্মাণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাইতুল মালের অর্থ ব্যয়ের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো খেলাফতের বাণিজ্যিক এবং কৃষি ব্যবস্থার প্রসারে খলিফা ওমর (রা.)-এর দীর্ঘমেয়াদি নৌপথের মহাপরিকল্পনা। তিনি মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস (রা.)-কে একটি বিশেষ ফরমান পাঠিয়ে লোহিত সাগরের সঙ্গে নীল নদকে সংযুক্তকারী একটি প্রাচীন ও মৃতপ্রায় বিশাল খাল পুনঃখননের নির্দেশ দেন। এটি ইতিহাসে ‘খালিজ আমিরুল মুমিনিন’ বা আমিরুল মুমিনিন সেচ ও নৌ-খাল নামে পরিচিত। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থায়নে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এই বিশালাকার খালের খননকাজ সম্পন্ন ও নৌ-রুটটি সচল করা হয়। এর ফলে মিসর থেকে সরাসরি লোহিত সাগর হয়ে মদিনার ‘জার’ বন্দর পর্যন্ত অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও দ্রুততম সময়ে বিশালাকার পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের এক স্থায়ী পথ উন্মুক্ত হয়। অবকাঠামোগত এই যুগান্তকারী উন্নয়নের ফলে খেলাফতের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যাতায়াত খরচ কমে আসে এবং কৃষি ও সেচব্যবস্থার অভূতপূর্ব আধুনিকায়ন ঘটে।
শূরা ও অর্থনৈতিক জবাবদিহি : ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মজলিসে শূরা (পরামর্শ সভা) এবং জনগণের কাছে সর্বজনীন জবাবদিহি। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের প্রতিটি দিরহাম আদায় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে খলিফাকে জনগণের সামনে জবাবদিহি করতে হতো। মদিনার সাধারণ একজন নাগরিকও খলিফাকে যেকোনো রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের উৎস ও যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন করার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতেন। খলিফা ওমর (রা.) নিজে ঘোষণা করেছিলেন, বাইতুল মালের সম্পদে তার অধিকার ঠিক একজন এতিমের অভিভাবকের মতো; সচ্ছলতা থাকলে তিনি শাসক হিসেবে কোষাগার থেকে ১ দিরহামও ভাতা নেবেন না আর যদি অভাব-অনটন থাকে, তবেই শুধু সাধারণ একজন নাগরিকের সমপরিমাণ সর্বনিম্ন খাদ্য ও পোশাক বাইতুল মাল থেকে গ্রহণ করবেন।
খিলাফতের প্রতিটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত তিনি মজলিসে শূরার প্রবীণ ও তরুণ সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ না করে কখনো একা নিতেন না। একবার ইরাক ও সিরিয়ার বিজিত ভূমির রাজস্ব বণ্টন নিয়ে খলিফা ওমরের সঙ্গে প্রবীণ সাহাবিদের দীর্ঘ তাত্ত্বিক দ্বিমত তৈরি হয়। খলিফা ওমর (রা.) নিজের একক ক্ষমতা খাটিয়ে সেই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে, তিনদিনব্যাপী মজলিসে শূরার জরুরি অধিবেশন ডাকেন। সেখানে তিনি পবিত্র কোরআনের সুরা হাশরের আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে সমবেত সবার সামনে নিজের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার যৌক্তিকতা প্রমাণ করেন এবং সবার ঐকমত্যের (ইজমা) ভিত্তিতে তা বাস্তবায়ন করেন।
মাওয়ালি ও সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা
খলিফা ওমরের কল্যাণ রাষ্ট্রে আরব ও অনারব বা মাওয়ালিদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। খেলাফত রাষ্ট্রে নতুন ইসলাম গ্রহণকারী অনারব নাগরিক এবং বিজিত অঞ্চলের প্রতিটি প্রান্তিক মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সবাই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করত।
ক্রীতদাসদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও আইনি সুরক্ষা
ইসলামের মানবিক দর্শনের আলোকে খলিফা ওমর (রা.) ক্রীতদাস প্রথার অবসান ও দাসদের মুক্ত করার প্রক্রিয়াকে শুধু একটি ধর্মীয় বা সামাজিক উপদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং একে আইনি ও অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি দাসদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য ‘মুকাতাবাত’ (চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে মুক্তি লাভ) প্রথাকে রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করেন। কোনো ক্রীতদাস যদি নিজের কর্মদক্ষতা ও পারিশ্রমিকের কিস্তির মাধ্যমে স্বাধীন হতে চাইত, তবে কোনো মালিকের তা প্রত্যাখ্যান করার আইনি অধিকার ছিল না। শুধু তাই নয়, মুক্ত হওয়ার পর এই নতুন স্বাধীন নাগরিকরা যাতে মূল অর্থনৈতিক স্রোতোধারায় মিশে যেতে পারে এবং পুঁজির অভাবে সমাজে অপরাধ বা অলসতায় জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য খলিফা বাইতুল মাল থেকে তাদের পুঁজিস্বরূপ বড় অঙ্কের এককালীন আর্থিক অনুদান বা সাহায্য দেওয়ার নিয়ম চালু করেন। একই সঙ্গে তাদের নাম রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বা ‘দেওয়ান’-এ তালিকাভুক্ত করে অন্য সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের মতোই নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করেন।
জাকাত ও সম্পদের সামাজিক পুনর্বণ্টন
জাকাত ইসলামি অর্থব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং মুসলমানদের জন্য একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক ইবাদত। সোনা, রুপা, নগদ অর্থ, কৃষিজাত ফসল, ফলমূল, গবাদি পশু, বাণিজ্যিক পণ্য এবং খনি থেকে পাওয়া গুপ্তধনের ওপর নির্ধারিত শরিয়তসম্মত হারে জাকাত সংগ্রহ করা হতো। খলিফা ওমর (রা.) জাকাত আদায়ের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা আমিল নিযুক্ত করেন এবং সংগৃহীত অর্থ শুধু কোরআন নির্দেশিত আটটি সুনির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করা হতো। সম্পদ যেন সমাজের নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত না থাকে, তা নিশ্চিত করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। জাকাত ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ফলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
খারাজ ও মানবিক ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা
বিজিত অঞ্চলের কৃষিজমির ওপর যে ভূমিকর বা রাজস্ব ধার্য করা হয়, তাকে খারাজ বলে। বিজিত অঞ্চলের জমি ব্যক্তিগত বণ্টনের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে রেখে খলিফা স্থানীয় কৃষকদের চাষাবাদের অধিকার বহাল রাখেন এবং সেখান থেকে খারাজ আদায়ের ব্যবস্থা করেন। তিনি জমির উর্বরাশক্তি, সেচব্যবস্থা এবং ফসলের ধরন অনুযায়ী করের হার নির্ধারণের জন্য ভূমি জরিপ ব্যবস্থা চালু করেন। তিনি জমি জরিপ ও কর নির্ধারণের আগে মদিনা থেকে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের পাঠিয়ে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করতেন। ইমাম আবু ইউসুফের কিতাবুল খরাজে বর্ণিত ভূমিনীতি দেখা যায়, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত জমি যোগ্য চাষিদের ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে খলিফা ওমর (রা.) বিজিত ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করেন।
ওশোর ও কৃষিজাত ফসলের কর
মুসলমানদের মালিকানাধীন ওশোরি জমিতে উৎপাদিত ফসলের ওপর শরিয়তের বিধান অনুযায়ী যে প্রদেয় ধার্য হয়, তাকে ওশোর বলা হয়। প্রাকৃতিকভাবে বা বৃষ্টির পানিতে স্বাভাবিকভাবে চাষাবাদ হওয়া জমির ফসলের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ এবং কৃত্রিম উপায়ে সেচ দেওয়া জমির ফসলের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে ওশোর আদায় করা হতো। এটি সরাসরি বাইতুল মালে জমা হয়ে জনকল্যাণে ব্যয় হতো।
রাষ্ট্রীয় খাসজমি ও পরিবেশ-অর্থনীতি নীতি (আল-হিমা)
খলিফা ওমর (রা.) আরবে প্রথম পরিবেশ, পশুপালনের ভারসাম্য এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় খাসজমি বা ‘হিমা’ নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। খিলাফতের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে (যেমন জিহাদের ঘোড়া ও জাকাতের উটের জন্য) তিনি মদিনার নিকটবর্তী ‘রাবাজা’ ও ‘শারাফ’ নামক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উর্বর চারণভূমিকে রাষ্ট্রীয় খাসজমি বা ‘হিমা’ ঘোষণা করেন। এই ব্যবস্থার মূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল—যাতে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিপুলসংখ্যক পশু নিয়ে সাধারণ, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জন্য উন্মুক্ত চারণভূমি দখল করে নিতে না পারে। তিনি এই খাসজমির দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হুনাইকে কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, একজন শাসকের অর্থনৈতিক পক্ষপাতিত্ব সর্বদা দরিদ্রদের পক্ষে হওয়া উচিত। বিত্তশালীদের অতিরিক্ত সম্পদ ধ্বংস হলেও তাদের বিকল্প আয়ের উৎস থাকে, কিন্তু একজন প্রান্তিক মানুষের একমাত্র সম্বল তার গবাদি পশুটি হারিয়ে গেলে সেই সপরিবার চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে।
খলিফা ওমরের এই খাসজমি নীতি সমাজে সম্পদের অসম প্রতিযোগিতা বন্ধে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিল।
আল-ফাই ও খুমুস (রাষ্ট্রীয় কল্যাণ তহবিল)
যুদ্ধ বা রক্তপাত ছাড়াই অমুসলিমদের কাছ থেকে সন্ধির মাধ্যমে যে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অর্জিত হতো, তাকে ‘ফাই’ বলা হয়। পবিত্র কোরআনের স্পষ্ট বিধান অনুসারে এই সম্পদের পুরোটাই আল্লাহ, তাঁর রাসুল, আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন ও পথিকদের কল্যাণে ব্যয় হতো। অন্যদিকে, সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত গনিমতের চার-পঞ্চমাংশ (৮০%) যুদ্ধজয়ী মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হতো। বাকি এক-পঞ্চমাংশ ‘খুমুস’ হিসেবে সরাসরি বাইতুল মালে জমা হতো এবং রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে ব্যয় করা হতো।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-এর-অর্থব্যবস্থা-ও-সংস্কার-73bfd4-720x405.webp)