এত অবৈধ অস্ত্র ও অস্ত্রধারীরা কোথায়

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

এত অবৈধ অস্ত্র ও অস্ত্রধারীরা কোথায়

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ছাত্র-জনতা যখন অধিকার আদায়ে রাজপথে, তখন তাদের দমাতে সশস্ত্র অবস্থান নেয় পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। আন্দোলন দমনে প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেয় হাসিনার সরকার। ওই নির্দেশের পর জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে রাজশাহীতে আন্দোলনকারীদের দমনে পুলিশের পাশাপাশি রাজপথে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নামে ছাত্র, যুব ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সন্ত্রাসীরা। এ সময় নগরীর সাহেববাজার, সোনাদিঘির মোড়, মালোপাড়া, তালাইমারী, বিনোদপুর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও কাজলায় দেখা গেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। তবে এখনো সিংহভাগ অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনি। এছাড়া চিহ্নিত সন্ত্রসীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে। জনসাধারণের মনে প্রশ্ন—এত অবৈধ অস্ত্র ও অস্ত্রধারীরা তাহলে কোথায় গেল।

বিজ্ঞাপন

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, জুলাইয়ের শেষদিকে টানা কদিন প্রায় শতাধিক আওয়ামী নেতাকর্মীকে ধারালো অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। এর বাইরে আরও অর্ধশতাধিক লোকের হাতে ও পকেটে ছিল অবৈধ পিস্তল। হামলায় তাদের ব্যবহৃত অন্তত অর্ধশত অবৈধ অস্ত্রের হদিস মেলাতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ৫ আগস্ট বিকাল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে অস্ত্রধারী ওইসব নেতাকর্মী ও সমর্থক আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি। অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধারে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার ও যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম রুবেলকে কয়েক দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। তবে অস্ত্রগুলো সম্পর্ক তারা কোনো তথ্য পুলিশকে দেননি বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। যদিও গত ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীদের ওপর প্রকাশ্যে দুই হাতে গুলি চালাতে দেখা যায় রুবেলকে। তবে রিমান্ডে রুবেল দাবি করেন, ওই অস্ত্র দুটি তাকে যুবলীগের এক নেতা দিয়েছিলেন। তাকে তিনি ওইদিনই ফেরত দিয়েছেন বলে রিমান্ডে পুলিশকে জানিয়েছেন। ওইদিন নিহত শিক্ষার্থী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম অবৈধ অস্ত্রের গুলিতেই নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, আওয়ামী, যুব ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ব্যবহৃত অস্ত্রের গুলিতেই তারা নিহত হয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, রাজশাহীতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে শুরু থেকেই মারমুখী আচরণ ছিল আওয়ামী লীগসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের। এমনকি আন্দোলনের সমর্থনে বিএনপি বা জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা মাঠে নামলে তাদেরও প্রতিহত করার চেষ্টা করা হয়। ভাঙচুর করা হয় বিএনপি মহানগর কার্যালয়ও। আন্দোলন দমাতে ওই সময় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিতে দেখা যায় আওয়ামী লীগ, যুব, ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকর্মীদের। বিশেষ করে গত ৪ ও ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমাতে পিস্তল, শটগান ও ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন যুবলীগ নেতা জহিরুল হক রুবেল, রাজশাহী কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি রাশিক দত্ত, মহানগর যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েক নেতাকর্মী।

আইনশৃঙ্খরা বাহিনীর একাধিক সূত্রমতে, গত ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের দিনই রাজশাহীতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। ওইদিন নগরীর তালাইমারী থেকে আন্দোলনকারীরা একটি মিছিল নিয়ে সাহেববাজারের দিকে গেলে আলুপট্টি এলাকায় পিস্তল, ককটেল, শটগান ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর। ওই সময় দুই হাতে গুলি করতে দেখা যায় রাজশাহীর শীর্ষ সন্ত্রাসী জহিরুল হক রুবেলকে। এর বাইরেও অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মীর হাতে পিস্তল-শটগান ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ওইদিন ঘটনাস্থলেই কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাকিব আঞ্জুম নামে এক শিক্ষার্থীকে। এছাড়া গুলিতে নিহত হন আলী রায়হান নামে আরেক শিক্ষার্থী।

ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র ও আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইশতিয়াক আহমেদ লিমন, মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌরিদ আল মাসুদ রনি, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রমজান আলীসহ হাজার চারেক নেতাকর্মী। তবে প্রথম সারির নেতাদের হাতে অস্ত্র দেখা না গেলেও তাদের অনুসারী অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মীর হাতে অস্ত্র দেখা গেছে। এছাড়া অন্তত পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীর হাতে ধারালো অস্ত্র দেখা গেছে। এর বাইরে আরও অন্তত ৩০ জনের পকেটে ছিল পিস্তল। সব মিলিয়ে ওইদিন অন্তত অর্ধশত অবৈধ পিস্তল নামানো হয়েছিল মাঠে। যাদের অধিকাংশই যুবলীগ ও ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থক।

পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ওইদিন রায়হান যে গুলিতে নিহত হন, সেটি ছিল অবৈধ অস্ত্রের। ছোট আকারের অস্ত্রের গুলিতে নিহত হন আলী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম। কাজেই বিষয়টি স্পষ্ট যে, পুলিশের গুলিতে রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম নিহত হননি। কিন্তু ওই ঘটনার পর ২-৩ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে গেলেও তাদের অস্ত্রগুলো এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি। সূত্রটির দাবি, আত্মগোপনে যাওয়া ব্যক্তিরা অস্ত্র সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেননি। নিশ্চয়ই অস্ত্রগুলো রাজশাহীতেই আছে। তবে এত দ্রুত তারা আত্মগোপনে যাওয়ার পরও অস্ত্রগুলো কীভাবে সরিয়ে ফেলল, সেটি নিয়েও চরম ধোঁয়াশার মধ্যে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যদিও অস্ত্রগুলো উদ্ধারে এখনো ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে তারা।

এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মাদ আবু সুফিয়ান বলেন, ‘বেশ কিছু অস্ত্র আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ব্যবহার করেছেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। কিন্তু সেগুলোর হদিস এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা অস্ত্র উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি। যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, রিমান্ডে তারা অন্যের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। যাদের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে, তারা দেশের বাইরে পলাতক আছেন বলে জানা যাচ্ছে। তবে অস্ত্রগুলো নিশ্চয়ই রাজশাহীতেই আছে। এ নিয়ে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগগুলো কাজ করছে।

সম্পাদনা: ইসমাঈল

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন