২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে যে ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত সংস্থা, তার মধ্যে কাজী রাকীবুল হক একজন। শাহাদাতের সময় তার বড় ছেলে কাজী এবাদ পড়তেন ক্লাস ফোরে, এখন তিনি খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক পড়ছেন রাজধানীর একটি কলেজে। এক যুগ আগের সেই বিভীষিকাময় সময়ে কী দেখেছিলেন তিনি? আব্বুর লাশ দেখে কেমন ছিল তার প্রতিক্রিয়া? আর এক যুগ পরে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন তিনি তার আব্বুকে? দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তি-স্বাধীনতার জন্য যিনি জীবন দিলেন, রাষ্ট্র-সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা তার পরিবারের? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে আমরা শাপলাশহীদের দ্বিতীয় প্রজন্মের মুখোমুখি হয়েছিলেন মুহিম মাহফুজ। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ প্রকাশিত হলো আজ।

মুহিম মাহফুজ : ২০১৩ সালের ৫ মে’র স্মৃতি আপনার মনে আছে? কীভাবে আপনার আব্বু শহীদ হলেন?
কাজী এবাদ : সেদিন সকালে আমি স্কুলে চলে গেছি, বাবাও চলে গেছেন দোকানে। বাবার নিজেরই দোকান ছিল। স্কুল থেকে আমি এলাম ৩টার সময়। আমি যখন আসছি, তখন দেখি আব্বু বের হচ্ছেন। ক্লাস ফোরে পড়ি তখন আমি। আমার তখন ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষা ছিল, খারাপ হয়েছিল পরীক্ষাটা। আব্বু একটু রাগারাগি করলেন, ‘তুমি কেন পরীক্ষায় খারাপ করছ?’ পরে আব্বু বের হয়ে গেলেন।
মুহিম মাহফুজ : আপনি তখন কোন স্কুলে পড়েন?
কাজী এবাদ : শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে।
মুহিম মাহফুজ : আপনার আব্বু কী করতেন সে সময়?
কাজী এবাদ : আব্বুর লেপ-তোশকের ব্যবসা ছিল।
মুহিম মাহফুজ : তারপর?
কাজী এবাদ : আমি বাসায় যাওয়ার সময় দেখছিলাম রাস্তায় জ্যাম, মারামারি। এই রোডটাতেই (যাত্রাবাড়ী-ডেমরা) সব হচ্ছিল। বাসায় এসে খেলাম। তারপর ঘুমালাম একটু। ঘুমের মাঝখানে আসরের আজান দিয়েছে। তখন আব্বু একবার ফোন করেছিলেন আম্মুকে। আম্মুর সঙ্গে কথা হয়েছিল। আম্মু তখন বুঝতে পারছিলেন, আব্বু ওখানে (মতিঝিলের শাপলা চত্বরে) গেছেন। তার আগেই আব্বুর ইনটেনশন ছিল যে, আব্বু যাবেন ওখানে। আব্বু এক মাস আগে যেটা হয়েছিল, ৬ এপ্রিল, সেই লংমার্চেও আব্বু গিয়েছিলেন। আব্বু ওখানে গিয়ে লেবুর শরবত, বিস্কুট, পানি—যা-ই পেরেছেন মানুষকে সাহায্য করেছেন। আব্বুর কথা ছিল—‘আমি প্রত্যক্ষভাবে না পারলেও পরোক্ষভাবে সাহায্য করি।’
মুহিম মাহফুজ : আপনার আব্বু কি বাসায় বলে যাননি?
কাজী এবাদ : আব্বুর যাওয়ার ইচ্ছা ছিল, বাট আম্মু বলছিলেন, ‘বেশি ঝামেলা হচ্ছে, যাওয়া লাগবে না।’ কিন্তু আব্বু তো মানবেন না। তখন আব্বু একটা বাহানা বের করলেন যে, ‘ঠিক আছে, আমার ডায়াবেটিসের ওষুধ নিয়ে আসি।’ আব্বু একটু রাগী মেজাজের ছিলেন। আম্মুর কথা ছিল--যদি ওষুধ না পাওয়া যায় বা কোনো সমস্যা হয়ে যায়। তবুও আম্মু বললেন, ‘যাও।’
আব্বু তখন হোমিওপ্যাথি ওষুধ খেতেন। জয়কালী মন্দিরের ওখান থেকে আনতেন। এখান থেকে পল্টন ও গুলিস্তান কাছাকাছি। তো আব্বু জয়কালী মন্দিরের উদ্দেশে বের হয়েছেন বাসা থেকে; বলছেন, ‘ওষুধ নিয়ে আমি দোকানে চলে আসব, সমস্যা নেই।’
তো আম্মু ৪টায় বুঝতে পেরেছেন—যখন আজান দিল, আব্বু ফোন করে জানালেন, আব্বু তখন ওখানে (শাপলা চত্বরে) আছেন। সচরাচর আমি খেলাধুলা করে বাসায় এসেছি সন্ধ্যাবেলা। সন্ধ্যার পর আমি পড়ছি। তখন দেখলাম, আম্মুর সঙ্গে দুবার কথা হয়েছে ফোনে। আরেকবার এশার নামাজের পরে আম্মুর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। আমি দেখলাম, আম্মু গ্রিলের দরজায় দাঁড়ায়া জোরে জোরে চিৎকার করছেন, ‘ইবাদের বাবা... ইবাদের বাবা...।’ তখন আমার মা আব্বুকে এটা বলেই ডাকতেন—আমি বড় ছেলে, সে হিসেবে। আম্মু চিল্লাচ্ছিলেন, বাট তখন কোনো শব্দ ওখান থেকে আসেনি।
মুহিম মাহফুজ : মানে আপনার আম্মু তখন ফোনে আপনার আব্বুর সঙ্গে কথা বলছিলেন?
কাজী এবাদ : হ্যাঁ। আম্মুর কাছ থেকে শুনতে পারছি, তখন আব্বু বলছেন, ‘ওপাশে মানুষজনের সঙ্গে গোলাগুলি চলছে, আর এপাশে (মঞ্চ থেকে) ভাষণ দিচ্ছে। মাঝখানে একটা ফাঁকা রাস্তা, সেখানে আমি হাঁটছি, কথা বলছি।’
আম্মু কথা বলছিলেন। ওই সময়টায় হুট করে আম্মু একটা শব্দ পেয়েছেন—জাস্ট একটা শব্দ পেয়েছেন। কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ বা গুলির শব্দ। বাট, একটা শব্দ পেয়েছেন ‘ঠাশ’ করে। তারপরে আর কোনো কথা আসেনি।
মুহিম মাহফুজ : কয়টার সময় এটা?
কাজী এবাদ : এটা আনুমানিক ৮টার পরের দিকে।
মুহিম মাহফুজ : সে সময় তিনি কোন জায়গাটায় ছিলেন, এটা কি বলতে পারেন?
কাজী এবাদ : কোন জায়গায়, সেটা আমরা বলতে পারছি না। ধারণা করছি, পল্টন থেকে মতিঝিলের দিকে যে রোডটা শাপলা চত্বরের দিকে গেল, ওই রোডটায়।
মুহিম মাহফুজ : এটাই লাস্ট কথা?
কাজী এবাদ : হ্যাঁ, এটাই লাস্ট কথা। আম্মু এর পর থেকে আব্বুকে ফোন করে আর রিচ করতে পারছিলেন না। ফোন করছেন, কিন্তু রিচ করতে পারছেন না।
মুহিম মাহফুজ : ফোনে রিং হচ্ছিল?
কাজী এবাদ : হ্যাঁ, রিং হচ্ছিল বাট রিসিভ হয়নি। আব্বুকে রিচ করতে পারছেন না কোনোভাবেই। এভাবে ১২টা বেজে গেল প্রায়। আম্মু কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। আম্মু সাড়ে ১১টা থেকে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন যে, এত সময় ফোন ধরে না—এ রকম তো কোনো সময় হয় না।
আমাদের পাশের বাসায় এক দাদু আছেন; আমি, আমার ছোট ভাই, আমার বড় আম্মু আর আমার মা। বড় আম্মু মানে আমার বড় চাচি। এই চারজন আমরা ওই বাসায় গেলাম।
আমাদের পাশের এক চাচার কাছে একটা কল এলো। আব্বুর পকেটে মানিব্যাগ ছিল, মানিব্যাগে আব্বুর দোকানের পাশের একটা ফার্নিচারের দোকানের কার্ড ছিল। ওই নাম্বারে ফোন আসছিল যে, রাকিব ভাইয়ের মাথায় গুলি লেগেছে।
এটা মনে হয় আমাদের ওই চাচা বলছিলেন আমার আম্মুর কাছে। তো সবাই অনুমান করেছে, ছিকা গুলি লেগেছে। তো আম্মু নামাজ পড়া শুরু করলেন, কান্নাকাটি শুরু করলেন। তখন প্রায় আড়াইটা বাজে। আম্মু নামাজ পড়ছেন, দোয়া করছেন। আমি ছোট ভাইকে নিয়ে শুয়ে আছি।
আড়াইটার দিকে একটা ফোন এলো আমাদের বাসায়। আমার চাচির ভাই, মানে আমার মামা ফোন করে বলছেন, রাকিব ভাই মারা গেছেন। আমার বড় আম্মুকে বলেছেন কথাটা। আমি ছোট মানুষ; যখন আড়াইটা বাজে ফোনটা এসছে, তখনই আমার বুকে কামড় দিয়েছে যে, হয়তো কোনো একটা খারাপ সংবাদ! আড়াইটা বাজে এটা শুনলাম। আমার বড় চাচার ছেলে, তিনি প্রায় সাড়ে ১২টা-১টার দিকে বের হয়ে গেছেন বাসা থেকে।
মুহিম মাহফুজ : আপনার আব্বুর খোঁজ করতে?
কাজী এবাদ : হ্যাঁ। আমার চাচা, আমার চাচি আর আমার এই ভাইয়া। তাছাড়া আমার আব্বার এক ফ্রেন্ড ছিল আবদুর রহমান নামে। তিনি আমাদের এলাকায় থাকেন। তারা চার-পাঁচজন একসঙ্গে বের হয়ে গেছেন খোঁজ করার জন্য। আব্বু তো এশার পর মারা গেছেন। লাশটা মানুষেরা মঞ্চের সাইডে (শাপলা চত্বরে) নিয়ে রেখেছিলেন।
মুহিম মাহফুজ : মানে লাশটা তারা নিতে পেরেছিলেন মতিঝিল থেকে?
কাজী এবাদ : না, অপারেশনের পরে নিতে পেরেছেন।
মুহিম মাহফুজ : তার মানে তো একেবারে ফজরের আগে?
কাজী এবাদ : হ্যাঁ, যখন ক্লিনআউট করছে তখন। লাশটা তারা (পুলিশ) ফজরের আগে নিয়ে গেল ঢাকা মেডিকেলে।
মুহিম মাহফুজ : কখন মেডিকেল থেকে রিলিজ দিয়েছে?
কাজী এবাদ : বেলা ৩টার দিকে। আমরা আসরের পরে মাটি দিয়েছি বাবাকে; মাতুয়াইল কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
মুহিম মাহফুজ : জানাজা হয়েছে কোথায়?
কাজী এবাদ : জানাজা হয়েছে আমাদের এলাকার মসজিদে (কাজলা ভাঙা প্রেস-লাগোয়া)।
মুহিম মাহফুজ : এটা সামাজিকভাবে মোটামুটি জানাজানি হয়ে গেল। এরপর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিকভাবে আপনারা কেমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন?
কাজী এবাদ : পুলিশ থেকে চাচাকে শুনতে হতো যে, এগুলো বলা যাবে না। আমরা মূলত ভয়ে থাকতাম। এই জিনিসটা (আব্বুর শহীদ হওয়ার কথা) তখন আমরা বলতে পারিনি কারো কাছে।
মুহিম মাহফুজ : কেন পারেননি?
কাজী এবাদ : কারণ সবার একটা ভয়, পুলিশের ভয় ছিল সবার ভেতরে।
মুহিম মাহফুজ : কেমন ভয়, বললে কী হতো?
কাজী এবাদ : মানে আগে থেকেই একটা থ্রেটের ভেতরে থাকতাম আমরা। কিছু বলা যাবে না; বললে সমস্যা হবে—পুলিশ এরকম হুমকি দিত আমার চাচাকে (শহীদের বড় ভাই কাজী শাহিদ)। এ রকম হুমকি অনেক পাওয়া গেছে।
আমার চাচা বলতেন, ‘আচ্ছা, এগুলো নিয়ে আর কোনো কথা বলার দরকার নেই। যদি আল্লাহ থাকেন, আল্লাহ এটার বিচার করবেন।’ তখন আমাদের সহানুভূতি (দেখভাল করা) আমাদের চাচা করেছেন সর্বোচ্চ। এর বাইরে গত ১০-১২ বছর তেমন কোনো উপকার বা ফিন্যান্সিয়াল সাপোর্ট আমরা পাইনি। বাট, লাস্ট এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেটা দিল, এটা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ। এর আগে মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের খেলাফত মজলিস অনেক সাহায্য করেছিল আমাদের।
মুহিম মাহফুজ : এক যুগ পর এখন সেই সরকার পরিবর্তন হয়েছে। আগে যেই বদ্ধ-ভীতিকর অবস্থা ছিল, সেটা এখন নেই। এখন আপনার প্রত্যাশা কী?
কাজী এবাদ : সর্বোচ্চ শাস্তি যেটা পাওয়ার, সেটা যেন কার্যকর করা হয়। এখানে সবচেয়ে বড় কথা হলো—আমাদের নবীকে অবমাননা করা হয়েছিল। আমি সে সময় ছোট মানুষ। বাট আমি এখন বুঝতে পারছি, নবীকে অবমাননা করা হচ্ছিল এবং সেখানে আমাদের মুসলিম ভাইয়েরা যারা যারা গিয়েছিলেন, তাদের ওপর জুলুম-অত্যাচার করেছে। সেটার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হোক, আমরা চাই। আমরা চাই, ভবিষ্যতে এ রকম আর যাতে কোনো সিচুয়েশন আমাদের দেশে ক্রিয়েট না হয়, পৃথিবীর কোনো দেশে ক্রিয়েট না হয়। এই দুটা জিনিস আমার চাওয়া।
মুহিম মাহফুজ : ২০১৩ সালে আপনার আব্বা যে পদক্ষেপ নিয়েছেন—নবীজির অবমাননার প্রতিবাদে যাওয়া, এটাকে আপনি এখন কীভাবে দেখছেন?
কাজী এবাদ : আমার বাবা যে কাজটা করেছেন, সেটার প্রতি আমি একশ পার্সেন্ট সহমত।
শ্রুতিলিখন : মোশাররফ হোসাইন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


