এক যুগের ক্ষতি
মে মাস আমার জন্য কষ্টের। মাসটি শুধু বসন্তের শেষ নয়, আমার শোকেরও মাস। ১৩ বছর আগে এই মাসেই আমার বড় ভাই, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা একেএম রেহান আহসানকে হারিয়েছিলাম। আজ এত বছর পরেও সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিগুলো মনে পড়লে বুকের ভেতর ভয়ানক শূন্যতা অনুভব করি। রেহান শুধু আমার বড় ভাই নয়, ছিল আমার শক্তি, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
২০১৩ সালের ৫ মে দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, আমাদের জীবনের কালো অধ্যায়। সেদিন শাপলা চত্বরে ন্যায়ের জন্য দাঁড়ানো মানুষের ভিড়ে আমার বড় ভাইও ছিল; কিন্তু সেই আশা শেষ হলো বর্বরতায়। রেহান জীবনে কখনো কাউকে আঘাত করেনি, অথচ সেদিন বর্বরতার নির্মম শিকার হলো। ওর মৃত্যু শুধু পরিবারের নয়, পুরো জাতির ক্ষতি। শহীদ রেহানের জন্ম ১৯৯১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। এ দিনটি আমাদের পরিবারের জন্য সবচেয়ে আনন্দের। মা সবসময় বলতেন, রেহান তাদের জীবনকে পূর্ণতা দিয়েছে। আমি তার ছোট বোন, তাই ছোটবেলায় তার যত্ন পাওয়া, তার সঙ্গে সময় কাটানো আমার জন্য ছিল সীমাহীন আনন্দের।
রেহান খুবই কৌতূহলী ছিল। ছোটবেলায় খেলনা খুলে ভেতরের গঠন বোঝার চেষ্টা করত। খেলনা গাড়ি দিয়ে খেলার চেয়ে সে বেশি মজা পেত সেটি কীভাবে চলে তা জানতে।
একজন বড় ভাই হিসেবে সে ছিল অতুলনীয়। আমার জীবনে এমন কোনো দিন নেই যখন সে আমার পাশে দাঁড়ায়নি। যখনই আমি হতাশ হতাম, সে বলত, ‘তুই পারবি। আমি তোর পাশে আছি।’ এই কয়েকটি শব্দই আমাকে সবসময় নতুন শক্তি দিত।
আমাদের পরিবারে রেহান ছিল এক আলো। ওর হাসি, ওর গানের সুর, ওর কৌতুকপূর্ণ কথা—সবকিছু যেন আমাদের বাড়ির দেয়ালগুলো জীবন্ত করে তুলত। আমি যখন তার পাশে বসতাম, মনে হতো সবকিছু ঠিক আছে। আজ সেই সুর নেই, হাসি নেই, নির্ভরতাও যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
এক প্রতিভাবান গণিতজ্ঞের উত্থান
রেহানের শিক্ষাজীবন আমাদের পরিবারের গর্বের ইতিহাস। ওর শিক্ষার যাত্রা ছিল একজন সাধারণ ছাত্র থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন প্রতিভাবান গণিতজ্ঞ হয়ে ওঠার কাহিনি।
গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল ছিল ওর শিক্ষার ভিত্তি। এখানেই গণিতের প্রতি ওর গভীর ভালোবাসা ও দক্ষতা সবার নজরে আসে। ২০০৭ সালে রেহান এসএসসি পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল করে। পরে ঢাকা সিটি কলেজে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে ওর প্রতিভা আরো বিকশিত হয়। ২০০৯ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় ওর অসাধারণ ফলাফলের মাধ্যমে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগ ওকে কলেজজীবনের প্রতিটি প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান অধিকার করতে সাহায্য করত।
একই বছর সে জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে সাফল্য অর্জন করে। ওর অর্জন আমাদের পরিবারকে গর্বিত করে। প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে সে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। এটি ছিল ওর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি হওয়া। ২০০৯ সালে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় সে ২১২তম স্থান অর্জন করে। এটি তখনকার সময়ে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক সাফল্য। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে ভর্তি হয়ে সে স্বপ্ন পূরণের পথে পা বাড়ায়। এ বিষয়টি ওর উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি এবং গণিতের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতিফল।

আদর্শের প্রতি অবিচল
রেহানের জীবনের মূল ভিত্তি ছিল ওর আদর্শ। এটি ওর প্রতিটি কাজ, চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করত। ওর বিশ্বাস ও নীতি ওকে অন্যদের থেকে আলাদা করত; প্রকৃত অর্থে একজন নেতা করে তুলেছিল।
রেহানের জীবনে ধর্ম ও ন্যায়বিচার ছিল একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সে প্রায়ই বলত, ‘একজন মানুষের ধর্ম যদি তাকে অন্যের উপকার করতে উদ্বুদ্ধ না করে, তাহলে তা কেবল একটি রীতি।’ এই দৃষ্টিভঙ্গি ওকে এমন মানুষ করে তুলেছিল, যে ন্যায়ের জন্য লড়াই করতে কখনো পিছপা হতো না।
২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের সময় সমাজে যে অসংগতি দেখছিল, সেগুলো নিয়ে সে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করে। সে দেখতে পেয়েছিল, কীভাবে কিছু মানুষ নিজেদের মতামত জোর করে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। যাদের বিশ্বাস ইসলাম ও বাংলাদেশ, তাদের ওপর অন্যায় করা হচ্ছে। ওর জন্য এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার সময়।
ব্লগারদের দ্বারা ইসলাম ও নবীজির প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য ওকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছিল। সে বিশ্বাস করত, প্রত্যেকের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত; কিন্তু তা কখনোই অন্যের বিশ্বাসের প্রতি অসম্মান দেখানোর কারণ হতে পারে না। ২০১৩ সালে শাপলা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে সে তার অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়। আমার ভাই জানত, এই পদক্ষেপ বিপদ আনতে পারে। কিন্তু সে আমাকে বলেছিল, ‘আমরা যদি এখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারি, তাহলে কবে পারব? সত্যের জন্য লড়াই করতে হলে সাহস এবং আত্মত্যাগের প্রয়োজন হয়।’ এই কথাগুলো আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে।
৫ মে’র মর্মান্তিক ঘটনা
আমরা ভাবছিলাম, এটি একটি সাধারণ দিন হবে। কিন্তু সেই দিনটি আমাদের জীবনে এমন এক দুঃস্বপ্ন নিয়ে এলো, যা আমাদের পরিবারের এবং অসংখ্য মানুষের জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছিল। যখন রাতের অন্ধকার নামল, তখনই শুরু হলো ভয়াবহতা। রাষ্ট্র তার সব শক্তি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের দমনে নেমে এলো। আকাশ ভারী হয়ে উঠল বিষাক্ত ধোঁয়ার গন্ধে, গুলির শব্দ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, আর নিরীহ মানুষের দেহ একের পর এক মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল। কেউ জানত না কী হচ্ছে; প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অজানা ভয়ের। ঢাকা শহরের রাস্তাগুলো রূপান্তরিত হয়েছিল এক নির্মম থিয়েটারে, যেখানে মানুষের জীবন ছিল এক নিষ্ঠুর শক্তির হাতে জিম্মি।
৬ মে সকালের আলো যখন শহরকে আলোকিত করল, সেই আলো ছিল মৃত্যু এবং ধ্বংসের ছায়ায় আচ্ছন্ন। রক্ত চারদিকে ছড়িয়ে ছিল, আর শাপলা চত্বরের প্রতিটি কোণ সাক্ষ্য দিচ্ছিল এক নির্মম গণহত্যার। এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ছিল কোনো আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করার জন্য নয়; এটি ছিল সুপরিকল্পিত গণহত্যা। সে রাতের অসংখ্য শহীদের মধ্যে ছিল আমার ভাই।
আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি, সেদিন মর্গে গিয়ে তার মৃতদেহ দেখার সেই মুহূর্তটি। মা যখন তার ছেলেকে দেখতে পেলেন, তিনি অসহায় আর্তনাদে ভেঙে পড়লেন। ‘রেহান!’ এই একটিই শব্দ তিনি বারবার উচ্চারণ করছিলেন, যেন তার কণ্ঠস্বর ওকে জীবিত করে তুলবে। একসময় মা জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। আমি তখন দাঁড়িয়ে ছিলাম অসহায়ভাবে। মনে হচ্ছিল, সময় থেমে গেছে।
একটি সরু স্ট্রেচারে শুয়ে ছিল আমার ভাইয়ের নিথর দেহ। ওর পেছনে আঁচড়ানো চুল, ওর সুরেলা কণ্ঠ, প্রাণবন্ত হাসি—সবই চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওর মুখে আমি এক ধরনের শান্তি দেখেছিলাম, এক মৃদু হাসি। আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ ওকে শহীদের মর্যাদা দিয়েছেন।
রেহানকে হারানোর পরের দিনগুলো
রেহানের মৃত্যু আমাদের পরিবারের নয়, জাতির অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু স্বৈরাচারী শক্তি আমাদের ত্যাগকে নিঃশব্দে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। আমাদের চারপাশে ভীষণ ভয় ছড়িয়ে দিয়েছিল। প্রশাসন আমাদের দ্রুত দাফন করতে বাধ্য করেছিল—আমরা যেন কারো কাছে মৃত্যুর নির্মম সত্য প্রকাশ করতে না পারি।
আমার বাবা ছেলেকে হারিয়ে শোকের ভার আর সইতে পারলেন না। এক বছরের মধ্যেই আমরা তাকে হারালাম। এই শোকের বোঝা বহন করার জন্য আমার মা একা থেকে গেলেন। তার কষ্ট আমি প্রতিদিন দেখেছি—তার চোখে কোনো স্বপ্ন নেই, তার কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই। আমরা সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল নীরবতাই আমাদের একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু এই নীরবতা যেন আমাদের আরো বেশি যন্ত্রণা দিয়েছে, প্রতিটি দিন আমাদের আরো নিঃস্ব করেছে। তবু আমরা থামিনি। রেহানের জন্য আমাদের লড়াই ছিল বেঁচে থাকার মতোই জরুরি।
রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার
২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আমরা ন্যায়বিচারের জন্য মুখ খুলতে সাহস পাইনি। এত দিন ধরে আমাদের কণ্ঠ যেন কারাগারে বন্দি ছিল। প্রতিটি দিন আমরা শুধু নিজের ভয় আর কষ্টের সঙ্গে লড়াই করেছি। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের বছর আমার মা প্রথমবারের মতো দাঁড়ালেন। তিনি সাহস করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করলেন কাঁপা কাঁপা হাত আর চোখে অশ্রু নিয়ে। সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, আমার মা শুধু তার সন্তানের জন্য নয়, প্রতিটি শোকাহত মায়ের জন্য লড়ছেন।
সে সময় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এবং বুয়েট সিএসই ২০০৯ ব্যাচ রেহানকে স্মরণ করেছিল। যখন আমরা শুনলাম, আমাদের বুকের ভার হালকা হয়ে গেল। এত দিন আমরা যেভাবে চুপ ছিলাম, ভয়ে কিছু বলতে পারিনি, সেই বন্দিত্ব থেকে মুক্তির মতো অনুভব হলো। রেহানের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার—ওর সাহস, বিশ্বাস ও ন্যায়বিচারের প্রতি দৃঢ়তা এখনো বেঁচে আছে। ওর জীবন ছোট ছিল, কিন্তু প্রভাব বিশাল এক নদীর মতো।
প্রতিদিন আমি চেষ্টা করি এমনভাবে বাঁচতে, যাতে আমি ওকে সম্মান জানাতে পারি। যেন ওর আলো বহন করে চলি, যে আলো জীবনের অন্ধকার বিদীর্ণ করে দিয়েছিল।
আমার প্রিয় ভাই, তুমি যেমন জীবনযাপন করতে চেয়েছিলে, তেমনি করেছ। দোয়া করি আল্লাহ তোমাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে স্থান দিন। আমিন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

