ঢাকার কেন্দ্রস্থল মতিঝিলের শাপলা চত্বর—দিনের বেলায় ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা আর রাতের আঁধারে কখনো কখনো ইতিহাসের ভার বহন করা এক নীরব সাক্ষী। ২০১৩ সালের ৫ মে রাত সেই করুণ ইতিহাসের অমোচনীয় অধ্যায় হয়ে জেগে আছে। সেই কালো রাতের বর্বর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য অজানা গল্প, নিখোঁজ মানুষ আর অমীমাংসিত প্রশ্ন। মো. সিরাজুল ইসলাম তেমনি এক নিখোঁজ শাপলা-শহীদ।
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার তলন্দর গ্রামের সন্তান মো. সিরাজুল ইসলাম। জন্ম ১৯৮৯ সালে। চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারান। বড় ভাইদের সহায়তায় বেড়ে ওঠা সিরাজুল ছিলেন মেধাবী ও দায়িত্বশীল। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিলেন ভদ্র স্বভাবের ছেলে হিসেবে।
প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি কওমি মাদরাসা ধারার শিক্ষায় যুক্ত হন। পরে ময়মনসিংহের মাসকান্দায় অবস্থিত জামিয়া আরাবিয়া মিফতাহুল উলুম মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিসে অধ্যয়নরত ছিলেন। ২০১৩ সালেই দাওয়ারে হাদিসের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু ঘাতকের বুলেট তার সেই স্বপ্নের নূর নিভিয়ে দেয়।
২০১৩ সালের ৫ মে তারিখটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। এই দিন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শানে কটূক্তিকারীদের বিরুদ্ধে ঢাকা শাপলা চত্বরে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হচ্ছিল। ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্নে সংগঠিত এই জমায়েতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বহু মানুষ অংশ নেন। পরিবারকে না জানিয়ে শুধু হৃদয়ের তাগিদেই তিনি ঢাকায় চলে আসেন।
রাত গভীর হওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তৎকালীন স্বৈরাচার সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ, টিয়ার শেল নিক্ষেপ, সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে ঘুমন্ত নিরস্ত্র অসহায় মানুষকে আক্রান্ত করা হয়। ঠিক কী ঘটেছিল সেই রাতে? কতজন শহীদ হয়েছিলেন? হতাহত হয়েছিলেন কতজন? এই প্রশ্নগুলো আজও অমীমাংসিত।
পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, ৫ মে ভোরে সিরাজুল ইসলামের মোবাইল ফোন থেকে একটি কল আসে। ফোনের অন্য প্রান্তের ব্যক্তি জানান, এক তরুণকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে, পরে তাকে অন্য একজনের সঙ্গে একটি ভ্যানে তোলা হয়। সেই তরুণের পরিচয় হিসেবে সিরাজুল ইসলামের নাম উঠে আসে।
এরপর শুরু হয় পরিবারের খোঁজাখুঁজি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে তারা ছুটে যান। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান মেলেনি।
ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত সিরাজুল ইসলামের দেহের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিবার বলছে, তারা থানা, হাসপাতাল, মর্গ—সব জায়গায় খোঁজ করেছেন। কিন্তু কোনো রেকর্ড বা আনুষ্ঠানিক তথ্য তারা পাননি।
পরিবারের ধারণা—তাকে হয় গণকবরে দাফন করা হয়েছে অথবা লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন মহলে সে সময় অভিযোগ উঠেছিল—অভিযানের পর কিছু মরদেহ দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয় এবং সব মৃত্যুর হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। শহীদ সিরাজুলের ঘটনা কি সেই সন্দেহকেই প্রমাণ করছে না?
পরিবারের জন্য এই অনিশ্চয়তা শুধু আবেগের নয়, বাস্তবতারও। কোনো মৃত্যুসনদ নেই, কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই—ফলে আইনি ও সামাজিক অনেক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। এ ধরনের নিখোঁজ ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়—প্রমাণের অভাব এবং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অনুপস্থিতি। ফলে ব্যক্তি ধীরে ধীরে ইতিহাসের প্রান্তে সরে যান, থেকে যায় শুধু পরিবারের স্মৃতি আর কিছু বিক্ষিপ্ত বর্ণনা।
সিরাজুল ইসলামের গল্প সেই বৃহত্তর বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি—যেখানে একটি ঘটনার পরিণতি শুধু তাৎক্ষণিক নয়, দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের জীবনে গভীর ছাপ ফেলে।
সিরাজুল ইসলামের লাশ কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুধু পরিবারের দায়িত্ব না; একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের দায় এই শহীদের লাশ শনাক্ত করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


