ছয় ব্যবসায়ী গ্রুপের থাবায় ক্ষতিগ্রস্ত ২৮ ব্যাংক

রোহান রাজিব

ছয় ব্যবসায়ী গ্রুপের থাবায় ক্ষতিগ্রস্ত ২৮ ব্যাংক

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ছয়টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করেছে, যার ফলে অন্তত ২৮টি ব্যাংক গুরুতর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পাচার হওয়া এই অর্থ ও বিদেশে তাদের সম্পদের খোঁজে এখন জোরালো তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একাধিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করেছে। পাচার করা অর্থ উদ্ধারে গঠিত টাস্কফোর্সের এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়।

ছয় ব্যবসায়ী গ্রুপ হলো- বিতর্কিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলমের এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট, মরহুম জয়নুল হক সিকদারের সিকদার গ্রুপ, সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো, ওরিয়ন গ্রুপ ও নাসা গ্রুপ। তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক দখল ও নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে পাচারসহ নানা অপরাধে যুক্ত অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

যেসব ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট গ্রুপের কারণে ৯টি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক। এসব ব্যাংক থেকে গ্রুপটি প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে, যার পুরো অংশ এখন খেলাপির খাতায়। বর্তমানে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি ও আল আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংককে। ইতোমধ্যে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনডিএ করেছে ব্যাংকগুলো।

এস আলম গ্রুপের কারণে ১৩টি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত। ব্যাংকগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। এই গ্রুপের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক ও একীভূত পাঁচ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ দুই লাখ ২৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এ টাকার বড় অংশ পাচার করার প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি।

এস আলম গ্রুপের পাচার করা অর্থের খোঁজ ও উদ্ধারে ইসলামী ব্যাংক, জনতা ও একীভূত পাঁচ ব্যাংককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলো তিনটি এনডিএ চুক্তি সম্পন্ন করেছে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের আরেক মাফিয়া ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তার বেক্সিমকো গ্রুপের কারণে ১৪টি ব্যাংক আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ব্যাংকগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, জনতা, আইএফআইসি, ন্যাশনাল ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি, পদ্মা, ডাচ বাংলা এবং বেসিক ব্যাংক। এ গ্রুপের জন্য জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জানা গেছে, এসব ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা একাই জনতা ব্যাংকের, যার পুরো অংশ খেলাপি। এসব ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকটি এখন ধুঁকছে। বেক্সিমকোর ‘পাচার করা’ সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারে দায়িত্ব পড়েছে জনতা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ওপর। ইতোমধ্যে এ গ্রুপের বিদেশে সম্পদের খোঁজে ৯টি চুক্তি করা হয়েছে।

সিকদার গ্রুপের কারণে ১১টি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো হলো- একীভূত পাঁচ ব্যাংক, এবি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকটি দেড় দশক ছিল সিকদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। এ গ্রুপের পাচার করা অর্থ উদ্ধারে দায়িত্ব পড়েছে আইএফআইসি, একীভূত পাঁচ ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের ওপর।

এছাড়া ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপের জন্য সংকটে পড়ে ১১টি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, পূবালী ব্যাংক, ইউনিয়ন ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। এ গ্রুপের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও আল আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক।

জানা গেছে, নজরুল ইসলাম মজুমদার নাসা গ্রুপ ও তার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক থেকে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। এসব অর্থ ফেরত না দেওয়ার কারণে তার ঋণের স্থিতি দিন দিন বেড়েছে। এতদিন আওয়ামী সরকারের ক্ষমতার দাপটে মজুমদার ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিলেও খেলাপি হননি। এখন সব ঋণ খেলাপি। এ গ্রুপের পাচারের অর্থ উদ্ধার ও খোঁজের দায়িত্ব পেয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি সই করেছে।

ওরিয়ন গ্রুপের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে ১২টি ব্যাংক। সেগুলো হলো- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ইউসিবি, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও মেঘনা ব্যাংক। অর্থ উদ্ধারে দায়িত্ব পেয়েছে অগ্রণী ব্যাংক ও ইউসিবি। তাদের পাচার করা সম্পদের খোঁজে একটি এনডিএ সম্পন্ন হয়েছে। জানা গেছে, ওরিয়ন ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ১২ কোটি টাকা।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিভিন্ন সরকারি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত এই টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।

পরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার ও ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে টাকা পাচার ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ‘যৌথ তদন্ত দল’ গঠন করা হয়। এর নেতৃত্বে আছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সদস্য হিসেবে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর ও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সাচিবিক দায়িত্ব পালন করছে বিএফআইইউ। আইন, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনে সহায়তা দিচ্ছে।

যে ১১টি শিল্পগোষ্ঠী নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছিল, তার মধ্যে রয়েছে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ ও আরামিট গ্রুপ। এসব গ্রুপের পাশাপাশি মালিকদের ব্যক্তিগত আর্থিক বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হয়। এসব গ্রুপ দেশে ব্যাংক ও অন্য ব্যবস্থা থেকে কত সম্পদ অর্জন করেছে এবং দেশে-বিদেশে কত সম্পদ আছে, তা সংগ্রহ করে যৌথ তদন্ত দল। তাদের সবার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা করেছে দুদক। দেশে ও বিদেশে থাকা তাদের অনেকের সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত।

শেখ হাসিনার পরিবার ও ১১টি শিল্পগোষ্ঠী নিয়ে তদন্ত হলেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের বৈঠকে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ এবং অর্থ পাচারের তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম পর্যায়ে দেওয়ানি কার্যধারা শুরু করার জন্য ছয়টি গ্রুপকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করা হয়। ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর কাছে থাকা মোট খেলাপি ঋণের ৭৭ শতাংশই উল্লেখিত ছয় গ্রুপের। এ জন্য ছয় গ্রুপের তথ্য খুঁজে বের করতে এনডিএ করার সিদ্ধান্ত হয়।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন