২০১৩ সালের ৫ মে। ঘড়ির কাঁটায় তখন দিবাগত রাত ২টা ১৫ মিনিট। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে নিভিয়ে দেওয়া হয় চারপাশের সব আলো। এরপর শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম এক অন্ধকার অধ্যায়। ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ নামের তিন বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে সেদিন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই রাতের নৃশংসতা আর রক্তের দাগ মুছে ফেলার সব রকম চেষ্টা চালিয়েছিল তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু মুছে ফেলা যায়নি স্বজন হারানো পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস। এক সময়ের প্রাণোচ্ছল মানুষগুলো আজ কবরে, আর তাদের পরিবারগুলো বেঁচে আছে মৃতবৎ হয়ে। আমরা কথা বলেছি এমন ছয়টি শহীদ পরিবারের সঙ্গে, যাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এসব হৃদয়বিদারক চিত্র।
ভাঙা ঘর আর বার্ধক্যের বোঝা
শহীদ আবু হানিফের বাড়ি চর এলাকায়। তিনি ছিলেন পরিবারের বড় অবলম্বন। তাকে হারানোর পর অভাব আর অন্ধকার যেন আঁকড়ে ধরেছে তার পরিবারটিকে। হানিফের বৃদ্ধ পিতা এখন বালি উত্তোলনের ট্রলারগুলোতে শ্রমিকের কাজ করেন। যে বয়সে তার বিশ্রামে থাকার কথা, সেই বয়সে রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে তাকে হাড়ভাঙা খাটুনি করতে হচ্ছে। হানিফের মা বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ ও মারাত্মক অসুস্থ। অর্থের অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসাও হচ্ছে না তার। হানিফের ভাইয়েরাও কেউ সচ্ছল নন। পৈতৃক ভিটায় একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত নেই তাদের। একটি পুরোনো কাচারি ঘর ছিল, সেটিও এখন ভাঙাচোরা। চরম দুর্বিষহ অবস্থার মধ্য দিয়ে কাটছে তাদের প্রতিটি দিন।
একই চিত্র শহীদ শাহ আলমের পরিবারে। তার পরিবারে এখন শুধু আছেন তার বৃদ্ধা মা ও এক বোন। শাহ আলমের মায়ের বয়স ৮৫ বছরের বেশি। তার দেখাশোনা করার মতো কোনো পুরুষ স্বজন নেই। বোন বিবাহিত হলেও তার সাধ্য সীমিত। তবুও সাধ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে তিনি মাকে আগলে রাখার চেষ্টা করছেন। বসতবাড়ির অবস্থা এতটাই জীর্ণ যে, বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে।
ঘরছাড়া স্ত্রী-সন্তান ও ঋণের সাগর
শহীদ নিজামুল হকের মৃত্যুর পর তার পরিবারের ওপর নেমে আসে সামাজিক ও পারিবারিক লাঞ্ছনা। নিজামুলের মৃত্যুর পর স্বজনরাই তার স্ত্রী ও সন্তানকে ঘর থেকে বের করে দেয়। তারা এখন আশ্রয় নিয়েছেন নিজামুলের শ্বশুরবাড়িতে। আয়ের কোনো উৎস না থাকায় পরিবারটি এখন ঋণের সাগরে নিমজ্জিত। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে যে অনুদান পাওয়া গিয়েছিল, তার প্রায় ৯০ শতাংশই চলে গেছে পুরোনো ঋণ পরিশোধে।
শহীদ ফারহান রাজার গল্পটি আরো কষ্টের। ৫ মে রাতে তিনি গুরুতর আহত হন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সেখানেও ছিল চরম অবহেলা। পড়ে ছিলেন বিনাচিকিৎসায়। অনেক চেষ্টার পর তার চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়, দুটি অপারেশনও করা হয়। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি পরপারে পাড়ি জমান। নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, ফারহানের লাশ হাতে পেতে তার পরিবারকে সেই সময়ে তিন লক্ষাধিক টাকা খরচ করতে হয়েছিল। বর্তমানে পরিবারটি চরম অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছে।
অভিভাবকহীন শৈশব ও একাকী মা
শহীদ মোয়াজ্জেমুল হক নান্নুর পরিবারটিও আজ অভিভাবকহীন। তার তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। বড় মেয়ের স্বামী মারা যাওয়ায় তিনিও এখন বাবার বাড়িতেই আশ্রিত। ছোট ছেলেটি এখনও পড়াশোনা করছে, আর বড় ছেলের আয়ের পরিমাণ খুবই সামান্য। পুরো পরিবারটি এখন একজন দক্ষ অভিভাবকের অভাবে দিশাহারা।
অন্যদিকে, শহীদ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পারিবারিক বন্ধন ঢিলে হয়ে গেছে। সালাউদ্দিনের স্ত্রী শাশুড়ির (শহীদের মা) সঙ্গে থাকেন না। সালাউদ্দিনের এক ভাই থাকলেও তার কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান নেই। ফলে অসুস্থ শরীর আর একাকিত্ব নিয়ে এই শহীদের মা আজ কেবল চোখের জল ফেলছেন।
সেই রাতের গণহত্যার বিবরণ দিয়ে মুফতী রাশেদুল ইসলাম সিরাজী আমার দেশকে বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে আমি সিরাজগঞ্জের হাজী আহমাদ জান জামিয়া মাদরাসার ছাত্র ছিলাম। ১৩-১৪ বছর বয়সের কিশোর আমি দাঁড়িয়েছিলাম শাপলা চত্বরে। সেই বিভীষিকাময় রাতে জালিমের বুলেট আমার ডান পা কেড়ে নিল। শৈশবের স্বাভাবিক চপলতা থমকে গেল এক নিমেষেই। তিনি দাবি করেন, আমার শরীরের একটি অংশ শাপলা চত্বরের মাটিতে মিশে আছে।
অস্বীকারের রাজনীতি : ‘মৃত সেজে থাকার নাটক’
শাপলা চত্বরের সেই নৃশংসতা নিয়ে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা বক্তব্যগুলো ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর ও বিতর্কিত। ৫ মের অভিযানের পর জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাবি করেছিলেন, সেখানে কোনো নিহতের ঘটনাই ঘটেনি। তিনি বলেছিলেন, ‘সেখানে কেউ মারা যায়নি। পুলিশ যখন অভিযান শুরু করে, তখন আন্দোলনকারীরা গায়ে লাল রঙ মেখে মৃত সেজে শুয়ে থাকার নাটক করেছিল। পুলিশ কাছে আসতেই তারা দৌড়ে পালিয়ে যায়।’ সরকারের অন্য মন্ত্রীরাও দাবি করেছিলেন, হেফাজত কর্মীরা নিজেরাই কোরআন শরিফে আগুন দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল এবং রাষ্ট্র কেবল শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ন্যূনতম বলপ্রয়োগ করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) বারবার দাবি করেছিল, ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ ছিল একটি রক্তপাতহীন ও সুশৃঙ্খল অভিযান। তারা দাবি করেন, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে কেবল আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে, কোনো তাজা গুলি চালানো হয়নি। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ যখন ৬১ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে, তখন পুলিশ সেই তথ্যকে ‘বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দিয়ে সংস্থাটির কার্যালয়ে অভিযান চালায় এবং এর কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ‘অস্বীকারের সংস্কৃতি’ বজায় ছিল।
সঠিক মৃত্যু সংখ্যা আজও অজানা
তদন্তের অভাবে সঠিক মৃত্যু সংখ্যা আজও অজানা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অন্তত ৫৮ জন এবং অধিকার ৬১ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। তবে বেওয়ারিশ লাশ দাফনকারী সংস্থা ‘আনজুমান-এ-মফিদুল ইসলাম’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৩ সালের মে মাসে দাফনকৃত লাশের সংখ্যা অন্যান্য মাসের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি ছিল।
পরিসংখ্যান বলছে, ওই রাতে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার রাউন্ড তাজা গুলি এবং বিপুল পরিমাণ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়েছিল।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারহীনতার ১৩ বছর
ভুক্তভোগীরা জানান, ৫ মে রাতে মতিঝিল এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। দিগন্ত টেলিভিশন এবং ইসলামিক টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়ে এক ধরনের মিডিয়া ব্ল্যাকআউট তৈরি করা হয়। ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র প্রতিবাদকারীদের ওপর অতর্কিত হামলা ছিল আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড অনুযায়ী একটি ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মাটিতে পড়ে থাকা নিরস্ত্র মানুষদের পিটিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করেছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা মানুষের মাথা থেকেও রক্ত ঝরছে।
হাসিনার আমলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে বিচার চাইতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে তথ্য গোপন করা হয় এবং যারা সত্য বলার চেষ্টা করেছিলেন—তাদের ওপর চালানো হয়েছিল নির্মম নিপীড়ন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর এখন নতুন করে এই গণহত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

