ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, বিপর্যয়ের মুখে কৃষক

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, বিপর্যয়ের মুখে কৃষক

দেশজুড়ে টানা ভারী বর্ষণ, কালবৈশাখী এবং ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কৃষকের বোরো ধানসহ তলিয়ে গেছে বিভিন্ন ফসলের মাঠ। কোথাও বুক ও কোমর সমান পানিতে পাকা ধান, সয়াবিন, পেঁয়াজ, রসুনসহ নানা মৌসুমি সবজির ক্ষেত। সুনামগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, ঝালকাঠি, লক্ষ্মীপুর, নেত্রকোনাসহ দেশের হাওর অঞ্চলের হাজারো কৃষক পরিবার দিশাহারা। ক্ষতিগ্রস্তদের চোখের নোনা জল আর বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন কৃষকরা।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখীতে ভেঙে পড়েছে অনেক গাছপালা ও উড়িয়ে নিয়ে গেছে ঘরের চাল। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এসব এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ।

বিজ্ঞাপন

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে যেখানে চৈত্র-বৈশাখের এ সময়ে হাওরজুড়ে সোনালি ধানের ম ম ঘ্রাণে উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই হাহাকার আর লোনা জলের দীর্ঘশ্বাস। টানা কয়েকদিনের অঝোর বর্ষণ যেন কৃষকের সারা বছরের স্বপ্নকে নিমেষেই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। উপজেলার প্রধান শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত নলুয়াসহ ১২টি হাওরের চিত্র এখন অত্যন্ত করুণ।

উপজেলা কৃষি কার্যালয় বলছে, ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমির ৪৫ শতাংশ ধান এখনো মাঠে ছিল। কিন্তু মাঠের বাস্তবচিত্র আরো ভয়াবহ। গত সপ্তাহের সোমবার থেকে শুরু হওয়া ছয়দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে ক্রমে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসলাম উদ্দিন বলেন, অকাল এ দুর্যোগে কৃষকদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। দ্রুত ধান ঘরে তোলার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে টানা অতিবৃষ্টি ও অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে ২০০ হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওর-বিলজুড়ে কৃষকের বছরের পর বছর পরিশ্রমে ফলানো সোনালি ফসল নিমেষেই ডুবে গেছে পানির নিচে। এমন পরিস্থিতিতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক।

কৃষকদের অভিযোগ, খাল-বিল দখল, আইল-হাওরে অপরিকল্পিত পুকুর খনন এবং পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে এ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি নদীনালা ও খালের নাব্য কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর শ্রীমঙ্গলে মোট ১১ হাজার ৪১২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক টানা বর্ষণে নিম্নাঞ্চলগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে প্রায় ২১৫ হেক্টর জমির পাকা ও আধা পাকা ধান সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে গেছে।

অতিবৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া ফসলের মাঠ থেকে কষ্টে ঘরে তোলা ধান শুকাতে না পেরে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কৃষকরা। অনেক ধানেই ইতোমধ্যে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। এর সঙ্গে বাজারে ধানের অস্বাভাবিক কম দাম যুক্ত হওয়ায় চরম লোকসানে পড়েন তারা।

উপজেলার ছিলিমপুর গ্রামের কৃষক জুয়েল মিয়া কয়েকদিন আগে ধান কাটেন। কিন্তু রোদ না থাকায় শুকাতে পারেননি। ভেজা অবস্থায় রাখা ধানের বস্তা খুলে তিনি দেখেন, ধানের ভেতর থেকেই অঙ্কুর বের হচ্ছে। ভাঙা কণ্ঠে তিনি বলেন, বছরের সব পরিশ্রম শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই ধান আর ঠিকমতো বিক্রি করা যাবে না।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় কালবৈশাখী, বৃষ্টি ও টানা বর্ষণে ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে মাঠের পাকা ও আধা পাকা ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের সোনালি স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। এছাড়া সয়াবিন চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

‎উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েকদিনের দমকা হাওয়া ও ভারী বর্ষণে সয়াবিন গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অনেক জমিতে হাঁটুসমান পানি জমে ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে মৌসুমের প্রধান অর্থকরী ফসল হারানোর শঙ্কায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।‎

কৃষি বিভাগ জানায়, দেশে উৎপাদিত মোট সয়াবিনের প্রায় ৭০ শতাংশই রায়পুর উপজেলায় উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে চরবংশী ইউনিয়নে অধিকাংশ কৃষকই সয়াবিন চাষের ওপর নির্ভরশীল। গত দুই দশকে এ অঞ্চলের চরাঞ্চলে সয়াবিন চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।

‎উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে প্রায় সাত হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ করা হয়েছে। তবে কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টিতে ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অবশিষ্ট ফসলও পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‎রায়পুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম বলেন, কালবৈশাখী ও বৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যে ফসল প্রায় ৮০ ভাগ পেকে গেছে তা কেটে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে, হোক ধান বা সয়াবিন আর ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।

‎ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলায় বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর তাণ্ডবে রবি মৌসুমের বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফসল ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে এমন দুর্যোগে কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও দুশ্চিন্তা বিরাজ করছে।

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কাঠালিয়ায় প্রায় দুই হাজার ২৫২ হেক্টর জমিতে মুগ, তিল, ভুট্টা, সয়াবিন, সরিষা ও সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন রবিশস্যের আবাদ করা হয়। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ভালো ফলনের আশা করেছিলেন কৃষকরা। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও কালবৈশাখীতে প্রায় ৮৪২ হেক্টর জমির ফসল আংশিক এবং কোথাও কোথাও সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফাতেমা ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর কারণে রবিশস্যের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।

গত সপ্তাহের প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ও তৎপরবর্তী অবিরাম বর্ষণ ও বন্যায় নলছিটির কৃষকদের চোখের সামনে ভেসে গেছে সারা বছরের স্বপ্ন। মাটিতে মিশে গেছে শত শত কৃষকের ক্ষেতের ধান।

স্থানীয় কৃষি অফিসের তথ্য অনুসারে, নলছিটি উপজেলায় এ ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় প্রায় ২০০ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। বন্যার পানির কারণে অনেকের ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে কালবৈশাখীতে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে। গাছপালা উপড়ে পড়া, বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে এবং তার ছিঁড়ে যাওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২০ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছেন।

বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে মাঠে কাজ করছে পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা। তবে বিভিন্ন স্থানে গাছের ডাল ও খুঁটি ভেঙে পড়ায় মেরামত কাজে সময় লাগছে বলে জানা গেছে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার প্রতিনিধিরা]

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন