নৃশংস আঘাতে ভেঙে পড়া প্রাণ, ভালোবাসায় জেগে উঠল জীবন

জেলা প্রতিনিধি, শরীয়তপুর

নৃশংস আঘাতে ভেঙে পড়া প্রাণ, ভালোবাসায় জেগে উঠল জীবন

শরীয়তপুর সদর উপজেলায় কয়েকদিন ধরে বেওয়ারিস কিছু ঘোড়া মানুষের চোখে পড়ছিল—কখনো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, কখনো আবার বাজারের আশপাশে ঘুরে বেড়াতে। স্থানীয় কেউ কেউ তাদের খাবার দিত, কেউ আদর করত। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই নিরীহ প্রাণীগুলোর শরীরে ফুটে ওঠে নির্মমতার চিহ্ন—রক্তাক্ত ক্ষত, গভীর আঘাত আর যন্ত্রণায় ভরা চোখ।

গত ৩-৪ দিন ধরে উপজেলার মনোহর বাজার মোড় এলাকায় দুটি ঘোড়াকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঘুরতে দেখা যায়। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন, কোথাও চামড়া কেটে মাংস পর্যন্ত বের হয়ে গেছে। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছিল, চোখ বেয়ে নামছিল পানি—যেন নীরব আর্তনাদ জানাচ্ছিল তারা।

বিজ্ঞাপন

রোববার রাত ৯টার দিকে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে। এর আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আহত ঘোড়াগুলোর ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। বিষয়টি নজরে আসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছাআ) শিক্ষার্থীদের।

শিক্ষার্থীরা জানান, ঘোড়াগুলোর চিকিৎসার জন্য তারা সরকারি পশু হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সেখান থেকে প্রত্যাশিত কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন চিকিৎসক ঘটনাস্থলে গিয়ে সামান্য ওষুধ প্রয়োগ করে ফিরে যান এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা—বিশেষ করে সেলাই ও পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়টি এড়িয়ে যান।

26d443da-2a26-46b0-ba0c-3c31f6dcb0bd

এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা নিজ উদ্যোগে ডামুড্যা উপজেলা থেকে বেসরকারি ভেটেনারি চিকিৎসক ডা. সবুজ খানকে নিয়ে আসেন। পরে স্থানীয় যুবকদের সহযোগিতায় আহত ঘোড়াগুলোর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা হয় এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সেলাই দেওয়া হয়। বর্তমানে তাদের নিয়মিত পরিচর্যা ও চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসক ডা. সবুজ খান জানান, ঘোড়াগুলোর শরীরে ধারালো কিছুর আঘাতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। কিছু জায়গায় চামড়া কেটে মাংস পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ইনফেকশনও দেখা দিয়েছে। আমরা সেলাই করেছি, প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়েছি। নিয়মিত পরিচর্যা করলে তারা সুস্থ হয়ে উঠবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিক মিয়া বলেন, ঘোড়াগুলো কয়েকদিন ধরে আমার প্রতিষ্ঠানের সামনে ঘুরছিল। তাদের শরীরের অবস্থা দেখে খুব খারাপ লেগেছে। রক্ত ঝরছিল, চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে হয়ত তারা বাঁচত না।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বৈছাআর জেলা শাখার সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আল নাজির বলেন, এভাবে নিরীহ প্রাণীর ওপর হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। পৌর এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে—ফুটেজ যাচাই করলে দোষীদের শনাক্ত করা সম্ভব। আমরা তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ঘোড়াগুলোর মালিক না থাকায় কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে আমাদের পক্ষ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে আবার চিকিৎসা দেওয়া হবে।

অন্যদিকে, পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, প্রাণীর ওপর এমন নির্যাতন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ অভিযোগ দিলে আমরা অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

নির্মমতার শিকার এই নীরব প্রাণীগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শিক্ষার্থীরা ও স্থানীয়রা, তা ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হচ্ছে সর্বমহলে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—কারা এমন নিষ্ঠুরতার জন্ম দিল, আর কবে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে?

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন