পররাষ্ট্র উপদেষ্টার আসন্ন চীন সফর

প্রধান অগ্রাধিকার রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন

বশীর আহমেদ

প্রধান অগ্রাধিকার রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন

জুলাই বিপ্লবের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আগামী ২১ জানুয়ারি বেইজিংয়ে প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে। বহুল আলোচিত আসন্ন এই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দৃঢ় করাই হবে প্রধান অগ্রাধিকার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ-চীন বৈঠকে ঐতিহ্যগতভাবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও সামরিক খাতে সহযোগিতার বিষয়টি প্রাধান্য পেলেও এবারের বৈঠকে দুদেশের মধ্যে একটি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন কিছু ক্ষেত্র সামনে আসতে পারে।

বিজ্ঞাপন

প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হবে। তবে বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ঠিক কী হতে যাচ্ছে, অর্থাৎ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইস্যুটি বৈঠকে তোলা হবে কি না, অথবা চীনের পক্ষ থেকে যদি ইস্যুটি তোলা হয়, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, জুলাই বিপ্লবে উৎখাত হওয়ার পর শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং ভারতের পক্ষ থেকে নানামুখী বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতার ফলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে চীনের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

গত ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ওই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ফিরতি বার্তা পাঠানো হয় ঢাকার পক্ষ থেকে। এর পরপরই শুরু হয় সফরের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি।

গত মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের সভাপতিত্বে আসন্ন এই সফরের প্রস্তুতি ও এজেন্ডা চূড়ান্ত করতে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা ছাড়াও ইআরডি, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, পানিসম্পদসহ ১৫টি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ সশস্ত্র বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের নতুন বাতাবরণ তৈরিসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগের ব্যাপারে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প তুলে ধরা হয়েছে। এসব প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত এজেন্ডা তৈরি করা হবে।

আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক সম্পর্কে বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে চীনা অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্পের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পসহ পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশ কিছু প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও চীনকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আসন্ন সফরে প্রস্তাব দেওয়া হবে।

বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্পের ব্যাপারে বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা জানান, তিস্তা প্রকল্পের ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। আসন্ন বৈঠকে এ বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তোলা হবে কি না, অথবা চীনের পক্ষ থেকে যদি ইস্যুটি তোলা হয়, তাহলে বাংলাদেশের জবাব কী হবে, সে ব্যাপারেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

এবারের বৈঠকে স্বাস্থ্য খাতে চীনা বিনিয়োগের জন্য ঢাকার পক্ষ থেকে নতুন প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে ওই কর্মকর্তা জানান। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুটিও বিশেষ গুরুত্ব পাবে বৈঠকে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সামরিক খাতে সহযোগিতার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে। তবে সামরিক কোন কোন খাতে বাংলাদেশ সহযোগিতা চাইবে, তা এখনও চূড়ান্ত নয়। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নেওয়া সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের কর্মকর্তারা বৈঠকে জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তিন বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখনও কাজ করছেন।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই দ্বিপক্ষীয় সফরকে ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং হিসেবে দেখছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে বলেন, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এবারের সফরটি এক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আমাদের এটা ভুলে গেলে চলবে না, দীর্ঘ ১৫ বছর শেখ হাসিনা চীনাদের আস্থাভাজন ছিলেন। শেষ সময়ে এসে তিস্তা প্রকল্প ও দিল্লিকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির কারণে শেখ হাসিনার সঙ্গে চীনের দূরত্ব তৈরি হয়। এখন এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে একটি আস্থাশীল রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলা সবচেয়ে বেশি জরুরি। যেকোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেই দেশের সরকারকে আস্থায় আনা জরুরি।

ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, অতীতে চীন ব্যবসা ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিত। কিন্তু এখন কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সামনে চলে আসছে। চীন চায় বাংলাদেশ তাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) যোগ দিক। এটা চীনের একটি কৌশলগত পরিকল্পনা। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার আসন্ন চীন সফরকে চ্যালেঞ্জিং আখ্যা দিয়ে বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. শহীদুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, আমি মনে করি না, এই মুহূর্তে চীন পুরোপুরিভাবে বাংলাদেশকে আস্থায় নিতে পেরেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ঝুলে রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে কিছুই বলা হচ্ছে না। এখানে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। এছাড়া সামরিক খাতে সহযোগিতার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন যদি একটি আস্থার জায়গা তৈরি করে দেশে ফিরতে পারেন, তাহলেই তার চীন সফর সফল বলে গণ্য হবে।

উল্লেখ্য, আগামী ২০ থেকে ২৪ জানুয়ারি তিনি চীন সফর করবেন। এই সফরে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছাড়াও চীন সরকারের অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তা এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এছাড়া তিনি সাংহাইতে বেশ কয়েকটি হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি পরিদর্শনসহ চীনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার আসন্ন এই সফরের সময়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বছরব্যাপী যে কর্মযজ্ঞ চলবে তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন