আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

প্রথমবারের মতো উন্নয়ন বাজেটে বড় কাটছাঁট

ইমদাদ হোসাইন

প্রথমবারের মতো উন্নয়ন বাজেটে বড় কাটছাঁট

দেশের অর্থনীতিতে কাল্পনিক আর বায়বীয় সংখ্যা কমিয়ে বাস্তবতায় ফিরতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। আসছে ২০২৫-২৬ অর্থবছর অনেক দিক থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ অর্থবছরে বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করতে যাচ্ছে।

ফলে সব পদক্ষেপই নিতে হচ্ছে ভেবেচিন্তে। সে বিবেচনায় আগামী অর্থবছরের বাজেটও কমছে ৭ হাজার কোটি টাকা। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিও (এডিপি) চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। আগামী ৬ মে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভা হওয়ার কথা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার কাল্পনিক অঙ্ক থেকে বাস্তব অঙ্কে ফিরতে চাচ্ছে; এটি ইতিবাচক দিক। তবে বাস্তবায়নও করতে হবে সচেতনভাবে। সার্বিকভাবে আকার কমানো ইতিবাচক, কারণ অর্থায়নে সমস্যা রয়েছে। সব মিলিয়ে এটি একটি সঠিক পদক্ষেপ।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, চলতি অর্থবছরের মূল এডিপি ছিল দুই লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সে তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় নামানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

যদিও চলতি অর্থবছরের মূল এডিপিতে সরকারের অর্থায়ন ছিল এক লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা, আর বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছর উন্নয়ন কর্মসূচিতে সরকারের অর্থায়ন কমে এক লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় নামছে, আর বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৮৬ হাজার কোটি টাকায় নামানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রতি বছরের বাজেটের অঙ্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রে এডিপির বড় ভূমিকা থাকে। তবে এবার ব্যতিক্রম হচ্ছে। প্রতি বছর উন্নয়ন বাজেটের আকার বাড়লেও বছর শেষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। চলতি অর্থবছরের মার্চ মাস শেষে উন্নয়ন বাজেটে তথা এডিপি খরচ হয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর চেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়নের তথ্য সংস্থাটির ওয়েবসাইটে নেই। এদিকে ৯ মাসে ৮২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা অর্থছাড় হয়েছে, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের পর সর্বনিম্ন। গত অর্থবছরে এক লাখ ৭ হাজার ৬১২ কোটি টাকা ছাড় হয়েছিল।

উন্নয়ন বাজেট কমানোর সিদ্ধান্ত বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমার দেশকে বলেন, এডিপি কমানো দরকার ছিল। কারণ আমরা প্রতি বছরই উন্নয়ন বাজেটের যে বিরাট আকার দিয়ে শুরু করি, তা কখনই অর্জিত হয় না। এটি অনেক দিন থেকেই বলা হচ্ছিল।

তিনি বলেন, এডিপিতে যেসব প্রকল্প আছে, এগুলো যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। এখন দেখার বিষয়, দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পগুলোতে কোন ধরনের প্রকল্প অগ্রাধিকার পাচ্ছে। যেগুলো অপচয় কমাবে, সেগুলোর কোথায় কাটছাঁট হচ্ছেÑ সেদিক থেকে সার্বিকভাবে আকার কমানো ইতিবাচক। কারণ, অর্থায়নেরও তো সমস্যা রয়েছে। সব মিলিয়ে এটি একটি সঠিক পদক্ষেপ।

জানা গেছে, নতুন উন্নয়ন বাজেটে স্থানীয় সরকার বিভাগ চাহিদা দিয়েছিল ৪৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। তাদের বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৪০ হাজার ২৩ কোটি টাকা। সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ ৩৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছিল। তাদের বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৩১ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ ১৮ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা চাহিদা দিলেও তারা ২০ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ পাচ্ছে। এছাড়া রেলপথ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পাচ্ছে ১০ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য বিভাগ পাচ্ছে ৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা আর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পাচ্ছে ৮ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা।

এ অর্থবছর বিদেশি ঋণে উন্নয়ন কর্মসূচি কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১৪ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৮৬ হাজার কোটি টাকায় নামানো হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারি শেষে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৪ বিলিয়ন ডলারের সামান্য কিছু বেশি।

আগের অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড় হয় ৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের অদক্ষতার কারণে বিদেশি ঋণের অর্থছাড়ও সম্ভব হচ্ছে না। আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক বিলিয়ন ডলার কম ছাড় হয়েছে। বিপরীতে আগের নেওয়া বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ প্রতি মাসেই বাড়ছে। আট মাসে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ২৬৩ কোটি ডলারের বেশি, আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ২০৩ কোটি ডলার। আগামী অর্থবছর ঋণ পরিশোধের চাপ আরো বাড়বে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, চলতি অর্থবছরে নেওয়া বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ কোটি টাকা, সেটিও তো বাজেটেরই অংশ; এটা অর্জিত কোনো অঙ্ক নয়। সে হিসেবে আগামী অর্থবছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকাও যদি বাস্তবায়ন করতে পারে এবং যেসব প্রকল্প পাইপলাইনে আছে, সেগুলোর অর্থছাড় যদি বাড়ানো সম্ভব হয়, তবে সেটি আগের অর্জনের তুলনায় অগ্রগতি হবে।

আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাজেটের আকার কমাতে যাচ্ছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী বাজেটের মূল আকার ৭ হাজার কোটি টাকা কমছে।

প্রতি বছর ৫০ হাজার কোটি টাকা করে বাজেটের আকার বাড়ানোকে কাল্পনিক উল্লেখ করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এ বছরের বাজেট যে কমছে, এতে বলা হচ্ছে সেটি কাল্পনিক একটি সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করে করা হচ্ছে। গত বছরের বাজেটের তুলনায় তা কমিয়ে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি করা হচ্ছে; সেখানে তো ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো হচ্ছে, তার তো কোনো অর্জন হয়নি। সেখানে কল্পনাকে কাটছাঁট করা হচ্ছে, বাস্তব বাজেটকে কাটছাঁট করা হয়নি। আমার মনে হচ্ছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটিও অর্জন হবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন