রাজধানীতে মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সন্ধ্যা নামলেই মৌমাছির ঝাঁকের মতো মশা ছড়িয়ে পড়ছে বাসাবাড়ি, সড়ক ও খোলা জায়গায়। এতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন নগরবাসী। তাদের অভিযোগ, মশার উৎপাত বাড়লেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
নগরবাসীর ভাষ্য, মশার কামড়ে তাদের ঘুম হারাম হলেও সিটি করপোরেশনের যেন ঘুম ভাঙছে না। নিয়মিত ফগিং ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ জোরদার করা হলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না বলেও দাবি তাদের। তবে সিটি করপোরেশন থেকে বলা হয়েছে, মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে মূলত তিন প্রজাতির মশার বিস্তার রয়েছে—কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। শুষ্ক মৌসুমে শীত কম থাকা এবং দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কিউলেক্স মশার বিস্তার দ্রুত বাড়ে। নর্দমা ও জলাশয়ের দূষিত পানিতে এদের প্রজনন বেশি হয়। তাপমাত্রা বাড়লে কিউলেক্স মশার জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং স্ত্রী মশার রক্তপানের প্রবণতা ও ডিম উৎপাদনও বেড়ে যায়। ফলে তাদের বিস্তারও বাড়ে।
অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বাড়ে, যার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ায়। এছাড়া অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, লেক, ঝিল, জলাশয় ও ডোবায় প্রচুর মশা জন্ম নিচ্ছে। বিশেষ করে বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, শান্তিনগর, মালিবাগ, শাহবাগ, উত্তরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকার পরিস্থিতি বেশ নাজুক। অনেক জায়গায় ড্রেনেজ সংস্কারের কাজ চলায় পয়োবর্জ্য ও ময়লা জমে আছে। এছাড়া বদ্ধ পানিতে তৈরি হচ্ছে মশার লার্ভা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মশার উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে, বিকাল হলেই দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়। তবুও পুরোপুরি রেহাই মেলে না। অনেক পরিবার সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই শিশুদের মশারির ভেতরে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ, এসব মশার কামড়ে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া অনিবার্য।
মালিবাগের বাসিন্দা রুবেল আহমদ বলেন, তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগে কাজ করেন। দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতে হয়। মশার জন্য কোথাও দাঁড়ানো যায় না। এমনকি চা খেতে টং দোকানে এক মিনিট দাঁড়ালেই পায়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা বসে।
তিনি আরো বলেন, সন্ধ্যা নামলেই বাসা, বারান্দা, সড়ক ও পার্ক এলাকায়ও মশার উৎপাত বাড়তে থাকে। নিয়মিত ফগিং কার্যক্রমের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বনশ্রীর বাসিন্দা মেহেদি হাসান বলেন, রাতভর কয়েল, অ্যারোসল, বৈদ্যুতিক ব্যাট বা মশারি—সব ব্যবহার করেও স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, অপরিচ্ছন্ন ড্রেন, নির্মাণাধীন স্থানে জমে থাকা পানি এবং জলাবদ্ধতা মশার প্রধান প্রজননস্থল হয়ে উঠেছে। শুধু ওষুধ ছিটানো নয়, পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ফগিং, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
মাসব্যাপী এ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, মশক নিধনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, নাগরিকরা সচেতন না হলে এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করলে প্রয়োজন অনুযায়ী অঞ্চলভিত্তিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় বলেন, শুধু মশার ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য সামাজিক সচেতনতা ও নিয়মিত মনিটরিং বৃদ্ধি করতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


অধিবেশন শুরুর আগেই উত্তাপ
কয়েক ঘণ্টায় ২১টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি সৌদি আরবের