ভারতীয় আদানি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবাধীন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দেশের বিদ্যুৎ খাতকে এক ধরনের জিম্মি করে রেখেছে। অসম চুক্তি, ক্যাপাসিটি চার্জের বাধ্যবাধকতা এবং একতরফা শর্তের কারণে এ অপরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশের মোট বিদ্যুতের সিংহভাগ ওই উৎস থেকে আসার কারণে এসব কেন্দ্রের সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলেই জাতীয় গ্রিডে বড় চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে। আওয়ামী লীগের প্রতি আনুগত্য, প্রতিবেশী দেশের ইন্ধন ও হাসিনার দেশবিরোধী চুক্তির সুযোগে দেশের বিদ্যুৎ বিভাগকে তারা অসহায় বানিয়ে রেখেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশের গ্রিডভিত্তিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ৪৩-৪৫ শতাংশ আসে বেসরকারি আইপিপিগুলো (ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) থেকে। সামিট পাওয়ার, ইউনাইটেড পাওয়ার, ওরিয়ন গ্রুপ, কনফিডেন্স পাওয়ার ও ডরিন পাওয়ারের মতো বড় বড় স্থানীয় ও যৌথ মালিকানার আইপিপি কোম্পানিগুলো এখন দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে।
এসব কেন্দ্র থেকে সরকার বিদ্যুৎ গ্রহণ করুক বা না করুক প্রতি মাসেই গুনতে হচ্ছে নির্দিষ্ট ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ। গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে এ অলস আইপিপি ও রেন্টাল কেন্দ্রগুলোকে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবেই দিতে হয়েছে দুই লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ না নিলেও শুধু আদানির ঝাড়খণ্ড প্ল্যান্টকেই বছরে ৫,৮০০ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের চুক্তির মেয়াদে ১৪-১৫ লাখ কোটি টাকা পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দেশীয় বিদ্যুৎ সস্তা হলেও আদানির কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে অগ্রাধিকার দিতে হয়, অন্যথায় গুনতে হয় জরিমানা।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও হাজার হাজার কোটি টাকা পকেটে তোলার আইনি লাইসেন্স এবং সরবরাহ বন্ধ হলে দেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কাই বাংলাদেশকে আদানি ও আইপিপির কাছে জিম্মি করে রেখেছে। চুক্তিগুলো সার্বভৌম বা আন্তর্জাতিকভাবে নিবন্ধিত উল্লেখ করে তারা বলেন, দুর্নীতি বা চরম অনিয়মের অকাট্য আইনি প্রমাণ ছাড়া সরকার চাইলেই একতরফাভাবে অসম এ চুক্তিগুলো বাতিল করতে পারছে না। কারণ আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা হলে দেশের বিরুদ্ধে বড় আর্থিক জরিমানার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশ ভারতের অন্যান্য উৎস থেকে যেখানে গড়ে ৯.৩৩ টাকায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ পায়, সেখানে আদানির পেছনে খরচ করতে হচ্ছে ১৪.৮৬ টাকা।
অপ্রতিরোধ্য আদানি
দেশের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে ভারতের আদানি পাওয়ারের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আদানির ঝাড়খণ্ড প্ল্যান্ট এখন অন্যতম প্রধান কৌশলগত চালিকাশক্তি। ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের ১,৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন গোড্ডা কেন্দ্রটি (চুক্তিভিত্তিক ১,৪৯৬ মেগাওয়াট) একক উৎস হিসেবে দেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের ৮.২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত একাই পূরণ করে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদার এক-চতুর্থাংশ মেটানো হয় আদানির বিদ্যুৎ থেকে। দেশের বড় বড় কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো যখন জ্বালানি সংকটে বা রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ থাকে, তখন আদানির সরবরাহ গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষা করে। বাংলাদেশ ভারত থেকে যে ২,৬৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে, যার ৫৫ শতাংশেরও বেশি আসে আদানি থেকে। এসব কারণে বাংলাদেশকে প্রায়ই আদানির মেজাজ-মর্জি বুঝে কথা বলতে হয় বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।
সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক সামিট
পলাতক শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আজিজ খানের মালিকানাধীন সামিট গ্রুপ দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী অংশীদার। সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশ এবং জ্বালানি গ্যাস (এলএনজি) আমদানির অবকাঠামো এ গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে এ গ্রুপের অধীনে ১৭টিরও বেশি সচল বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যার মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১,৬৬৪ মেগাওয়াটের বেশি। দেশের বেসরকারি খাতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ২১ শতাংশ এবং দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশ এককভাবে সামিট গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস গ্যাস সংকট মেটাতে সামিট গ্রুপ কক্সবাজারের মহেশখালীতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) পরিচালনা করছে। এ টার্মিনালটির মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের মোট গ্যাস চাহিদার একটি বড় অংশ এ আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখার জন্য সামিট গ্রুপ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ফার্নেস অয়েল এবং অন্যান্য জ্বালানি আমদানি করে থাকে। তাদের নিজস্ব কোস্টাল ট্যাংকার এবং প্রায় এক লাখ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন স্টোরেজ সুবিধা রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির পাশাপাশি সামিট গ্রুপ দক্ষিণ এশিয়ায় সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো গ্রিন এনার্জি খাতে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
ভারতনির্ভর আমদানি
বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহকৃত মোট বিদ্যুতের ১৫-১৭ শতাংশ তথা ২,৬৯৬ মেগাওয়াট সরাসরি বিদ্যুৎ হিসেবে আমদানি করা হয়। এর প্রায় সবটুকুই আসে ভারত থেকে। ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানির গোড্ডা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এককভাবে আমদানি করা হয় ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ । ভারতের রাষ্ট্রমালিকানাধীন এনটিপিসি, দামোদর ভ্যালি করপোরেশন এবং সেম্বকর্প থেকে ভেড়ামারা গ্রিড লাইনের মাধ্যমে আসে আরো প্রায় ১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ করপোরেশন থেকে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে আসে ১৬০ মেগাওয়াট। এব বাইরে বাংলাদেশ প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে। প্রতি ইউনিটের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭.৮৭ টাকা।
শর্তের বেড়াজালে অজুহাতের ছড়াছড়ি
আন্তর্জাতিক বাজারে বেসরকারি বিদ্যুৎ চুক্তিতে সাধারণত ‘বিদ্যুৎ না দিলে দাম নেই’ ধরনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশের আইপিপি ও আদানির ক্ষেত্রে করা সিংহভাগ চুক্তিতেই এ নিয়ম রাখা হয়নি, যা রাষ্ট্রকে একতরফা লোকসানের জালে আটকে ফেলেছে। চুক্তির শর্তানুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ ও জ্বালানি বিল ডলারে পরিশোধ করতে হয়। দেশের তীব্র ডলার সংকটের কারণে বিল বকেয়া পড়লে তারা উৎপাদন কমিয়ে দেয় বা বন্ধের হুমকি দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, বিল পরিশোধে বিলম্ব হলেই এসব কেন্দ্রের মালিকপক্ষ যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাত সামনে নিয়ে আসেন। কখনো কয়লার অভাব, আবার কখনো অন্য কারণ দেখিয়ে আদানির গোড্ডা কেন্দ্র এবং সামিটের মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল থেকে বন্ধ হয়ে যায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ।
মাফিয়া গোষ্ঠীর অপতৎপরতা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার সময় মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল রাষ্ট্রমালিকানায়। ক্ষমতাসীন হয়ে দলীয় লোকজনকে লুটের সুযোগ করে দিতে নির্বিচারে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয় হাসিনা সরকার। তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, শেখ হাসিনার পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সামিট গ্রুপের আজিজ খান, ফেনীর সাবেক এমপি আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম, নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান, আওয়ামী লীগপন্থি ব্যবসায়ী ওরিয়ন গ্রুপের ওবায়দুল করীম, জাতীয় পার্টির নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজমের পরিবার পায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লাইসেন্স। নাম-বেনামে দলটির আরো বেশ কয়েকজন নেতা ও পরিবারের সদস্যও রয়েছেন এ তালিকায়। ফলস্বরূপ এক সময় পুরো খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মাফিয়া গোষ্ঠীর হাতে। দলীয় আনুগত্যের কারণে হাসিনার নির্দেশনায় সুযোগ পেলেই তারা সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করছে। জিম্মি করছে বিদ্যুৎ খাত, তথা পুরো দেশকে।
উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ
গত ১৭ বছরে জ্বালানিসমৃদ্ধ বাংলাদেশকে আমদানিনির্ভর করা হয়েছে মন্তব্য করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম আমার দেশকে বলেন, আমরা এখন বেসরকারি উদ্যোক্তা ও ভারতের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ বিভাগ সম্পূর্ণভাবে জিম্মি না হলেও অতীতের কিছু চুক্তি ও আইনি কাঠামোর কারণে আদানি গ্রুপ এবং বেসরকারি আইপিপিগুলোর কাছে একটি বড় ধরনের নীতিগত ও আর্থিক ফাঁদে আটকে রয়েছে।
তিনি বলেন, আইপিপি এবং বিশেষ করে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সচল থাকুক বা না থাকুক, তাদের নির্দিষ্ট হারে একটি স্থায়ী ফি দিতেই হয়। ভারতের অন্যান্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় আদানির বিদ্যুতের দাম প্রায় ৩৯.৭ শতাংশ বেশি। আদানির ঝাড়খণ্ডের বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারতীয় করপোরেট ট্যাক্সের বোঝাও বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং আইপিপিগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে হবে বলেও জানান তিনি।
সব দোষ সরকারের
এর আগে আমার দেশের সঙ্গে আলাপকালে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, সরকার তার নীতিমালার আলোকে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। আমরা চুক্তির বাইরে কখনো কিছু দাবি করছি না। কাজেই উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ খাতকে জিম্মি করা কিংবা ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লুটপাটের অভিযোগ তোলা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ছাড়া আমাদের মতো দেশে কেউ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে আসবে না। কাজেই কুইক-রেন্টালের লুটপাটের জন্যে উদ্যোক্তাদের দায়ী করা যাবে না। সরকার কেন লুটপাটের সুযোগ করে দিল, তা তাদেরই জিজ্ঞেস করতে হবে মন্তব্য করে বিপ্পা সভাপতি বলেন, অভিযোগের জবাব তারাই দিতে পারবেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

