আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করা ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য

বিপ্লব-উত্তর এক বছরে বাংলাদেশের অর্জন কী

এম ওসমান সিদ্দিক ও জন ড্যানিলোভিচ

বিপ্লব-উত্তর এক বছরে বাংলাদেশের অর্জন কী

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এখনো জীবন্ত জুলাই বিপ্লবের চেতনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে থাকা গ্রাফিতি এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বক্তব্যেই ফুটে ওঠে সে সময়ের ভয়াবহতার চিত্র।

ক্যাম্পাসের মধ্য দিয়ে একবার হেঁটে গেলেই হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির এক বছর পূর্তির উৎসবমুখর পরিবেশ ও আবহের দেখা মেলে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এ চিত্রগুলোই বলে দিচ্ছে, আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররা পতিত সরকারকে আর ক্ষমতায় ফিরতে দেবে না।

বিজ্ঞাপন

গত ৫ আগস্ট হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির এক বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা কার্যত শেষ হয়। ড. ইউনূস এ সময় জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন, যেখানে জুলাই বিপ্লবের মূলনীতিগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদের ব্যাপারে একমত হয়েছে, যেখানে আরেকটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের উত্থান রোধে সংস্কারের জন্য তাদের যৌথ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা এবং সংস্কারের বিষয়ে একমত নির্বাচনি রাজনীতিতে ফেরার স্পষ্ট লক্ষণ।

ক্ষমতাগ্রহণের এক বছর পর অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক অর্জন আছে উদযাপনের জন্য। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছিল, দ্রুততার সঙ্গে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশকে মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসে এ সরকার। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের ক্ষমতায় থাকাকালীন সিভিল সার্ভিস এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে যে পরিমাণ রাজনীতিকরণ করা হয়েছিল, তা বিবেচনা করলে এটি কোনো সহজ কাজ ছিল না। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক বিভাগ দ্রুত এবং দৃঢ়তার সঙ্গে পদক্ষেপ নিয়েছিল, যাতে হাসিনার ঘনিষ্ঠজনদের দ্বারা লুট করা ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রাথমিক পতন ঠেকানো যায়। তাদের চেষ্টার ফলে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদাররা দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভ করেন। এ সময় বাংলাদেশ তার ঐতিহ্যবাহী অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করছে। বিশেষ করে হাসিনার আমলে হুমকির মুখে পড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিয়েছে বাংলাদেশ।

ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে আলোচনার পর ৩১ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যসংক্রান্ত একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রতিযোগিতামূলক ২০ শতাংশ শুল্কারোপ করা হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চায়নার সঙ্গেও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলছে। গত মার্চে ড. ইউনূস চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে এপ্রিলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ইউনূসের সাক্ষাৎ সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক শীতল রয়ে গেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের মুখোমুখি হওয়া সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হলো হাসিনার আমলে সংঘটিত অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রদান করা। এ অপরাধগুলো কেবল জাতিসংঘ নথিভুক্ত ২০২৪ সালের আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের ওপর সংঘটিত ভয়াবহতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর আগে ঘটে যাওয়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং অন্যান্য নির্যাতন রয়েছে। সরকার পতনের পর বিশৃঙ্খলার মধ্যে অনেক অপরাধী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় বিচার কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসিনা এবং তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। যেখানে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা স্বাধীনভাবে একে অন্যের সঙ্গে দেখা করছেন।

শেখ হাসিনাকে নির্বাসনে রেখেই ২০২৪ সালের নির্মমতার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তার এবং অন্যদের বিচারকাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকায় হাসিনার প্রাক্তন সরকারি বাসভবনের মাঠে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছে নির্যাতনের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।

শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বিচার শেষ না হওয়ার আগ পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। তাই আগামী নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা খুবই কম। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বর্তমানে আটক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে চলেছে। তারা বলছে, অনেককে এমন অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যা তাদের আটকের ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ওই সময় সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং গবেষকদের ভিসা প্রদানে অস্বীকৃতি জানাত সরকার। এছাড়া বাকস্বাধীনতাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কিন্তু দেশটি এখন আবার তার দরজা খুলে দিয়েছে, তাই বিশ্ববাসীর বাংলাদেশের দিকে আরো মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন