দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতের প্রত্যাশিত গতি বাড়ানো, সংস্কার ও মান বৃদ্ধির আশ্বাস দেয়। তবে গত বছর প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতের অস্থিরতা কমেনি বরং বেড়েছে। এ সময়ে পদায়ন ও বদলি নিয়ে বিতর্ক, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য সহকারীদের ধারাবাহিক আন্দোলন পুরো স্বাস্থ্য খাতে অচলাবস্থা তৈরি করে। জুলাই বিপ্লবের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রভাব এবং চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় থাকা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধের সরাসরি প্রভাব পড়ে পুরো স্বাস্থ্য খাতে। ফলে বিগত বছরগুলোতে মুহ্যমান স্বাস্থ্য খাত আরো নাজুক হয়েছে।
স্বাস্থ্যের ১৪ খাতে অর্থ বরাদ্দ হয় অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে। কিন্তু গত বছরের জুন থেকে ওপি বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্বাস্থ্যের সব উন্নয়নমূলক কাজে স্থবিরতা নেমে আসে।
দায়িত্ব নিয়েই স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে চিকিৎসক নিয়োগ, হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো, মানহীন মেডিকেল কলেজ বন্ধ, রাজধানীতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) ক্লিনিক চালুসহ স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তনে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে প্রায় সবগুলোই আশ্বাসের মধ্যেই আটকে আছে। এমনকি স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সংস্কার কমিশনের দেওয়া ৩২ সুপারিশের দু-একটি ছাড়া আলোর মুখ দেখেনি কোনোটিই। এমন ভগ্নদশা নিয়েই স্বাস্থ্য খাত আরো একটি বছর পার করল।
বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল পদ দখল
গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে স্বাস্থ্য খাতের ভার তুলে দেওয়া হয় নূরজাহান বেগম ও বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমানের কাঁধে। দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে চরম বাধার মুখে পড়তে হয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নিয়োগ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি চিকিৎসকদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে প্রায় দেড় মাস প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে দুই দফায় পরিবর্তন করা হয় মহাপরিচালক।
তবে দায়িত্ব নিলেও বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফরের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। উল্টো চরমভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। গত বছরের ৮ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি চিকিৎসক বদলির ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিচালক, লাইন ডিরেক্টরসহ গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ দখল নিয়ে প্রকাশ্যেই বিতর্কে জড়িয়েছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থি চিকিৎসকরা।
তৃণমূলে ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা
চলতি অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের মাত্র পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে, যা গত দুই দশকের গড়ের কাছাকাছি। অন্তর্বর্তী সরকারও এই ধারা থেকে বের হতে পারেনি। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আগের মতোই রয়ে গেছে। তৃণমূলে রোগী বাড়লেও চিকিৎসক সংকটে ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা।
গত ৭ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান জানান, দৈনিক গড়ে ১৫ হাজার মানুষ হাসপাতাল মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এ সংকট কাটবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নষ্ট যন্ত্রপাতি এক বছরেও পুরোপুরি চালু হয়নি। রাজধানীর বাইরেও একই চিত্র।
এর বড় কারণ চিকিৎসক সংকট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশের হাসপাতালে ১২ হাজার ৯৮০ চিকিৎসকের পদ শূন্য। এর মধ্যে ৪৯২ উপজেলা হাসপাতালে প্রায় সাড়ে সাত হাজার চিকিৎসকের ৫৩ শতাংশই খালি। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেবায়।
সংকট কাটাতে সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আয়োজন করা হয় বিশেষ বিসিএস। কিন্তু সুপারিশের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পদায়নে গেজেট হয়নি।
জুলাই বিপ্লবে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে অবহেলা
জুলাই বিপ্লবে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে নানা অভিযোগ ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনার ঘাটতির কথা জানিয়েছেন আহত ও তাদের স্বজনরা। এতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও মানবিক দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিশ্রুতি দিয়েও বাড়েনি শয্যা, বন্ধ হয়নি মানহীন মেডিকেল কলেজ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সারা দেশে রোগী অনুযায়ী ১৫ হাজারের বেশি শয্যার ঘাটতি রয়েছে। এতে করে অধিকাংশ রোগীকে ঢাকায় ছুটতে হয়। এই ভোগান্তি লাঘবে শুধু জনবলের অভাবে অচল ৮১ স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে অন্তত এক হাজার শয্যা চালুর উদ্যোগের কথা জানায় সরকার। তবে এক বছরেও এর বাস্তবায়ন হয়নি।
শহরাঞ্চলের প্রায় সাত কোটি মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিতে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরে ‘জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) ক্লিনিক’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে ঢাকা শহরে চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান। তবে এখন পর্যন্ত একটি ক্লিনিকও দৃশ্যমান হয়নি।
নজর দেওয়া হয় স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতেও। সরকারি-বেসরকারি মিলে মানহীন ২৬টি মেডিকেল কলেজ চিহ্নিত করা হয়, যা বন্ধের পরিকল্পনা করলেও সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
আলোর মুখ দেখেনি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ
গত বছরের ৫ মে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নিরসনে সংস্কার প্রস্তাব জমা দেয় স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন। ওই সময় যেসব সুপারিশ এখনই বাস্তবায়নযোগ্য, তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু বছর শেষে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা ছাড়া বাস্তবায়ন হয়নি আর কোনো সুপারিশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

