আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

শিশুর চোখে কেন উঠছে চশমা

এমরানা আহমেদ

শিশুর চোখে কেন উঠছে চশমা

রাইমা। বয়স ৭। কাছের এবং দূরের সবকিছুই সে ঝাপসা দেখে। চিকিৎসক তার চোখ পরীক্ষা করে, চশমা ব্যবহার করতে দিয়েছেন। ঘুমানোর সময়টুকু ছাড়া সব সময় তাকে চশমা পরেই থাকতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন চিকিৎসক। গতকাল সরেজমিন আমার দেশ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় রাজধানীর আগারগাঁও থেকে ফার্মগেট ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রাইমার মা রেণু আক্তার এ কথা জানান।

বিজ্ঞাপন

সাভার থেকে বাবার সঙ্গে এসেছেন জিসান (৯)। এক বছর আগেই তাকে চিকিৎসক চশমা ব্যবহার করতে বলেছেন। চোখে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ছেলেকে নিয়ে আবার চিকিৎসকের কাছে এসেছে বাবা রায়হানুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘চশমা ছাড়া খালি চোখে আমার ছেলে এখন কিছুই দেখতে পায় না। অতিরিক্ত মোবাইল, টিভি, ট্যাব, ল্যাপটপ ব্যবহারের কারণে তার চোখের এই দশা।’

রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নিলুফার। দূরের জিনিস ঝাপসা দেখে নিলুফার। এ জন্য বাবার হাত ধরে চিকিৎসা নিতে এসেছে। নিলুফার বাবা হাসান ইকবাল বলেন, ‘চার বছর বয়স থেকে মায়োপিয়া বা চোখের ক্ষীণদৃষ্টি রোগে ভুগছে নিলুফার। চিকিৎসকের কাছে নিলে ওর এই সমস্যা শনাক্ত হয়।’

শিশু রাইমা, জিসান, নিলুফার, আরিয়ান, জোহান নিলয়ের মতো বর্তমানে শহরের বেশির ভাগ শিশুরই নাকের ডগায় ঝুলে থাকতে দেখা যায় চশমা। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ডিজিটাল স্ক্রিনে (পর্দায়) চোখ থাকায় শিশুদের চশমা ব্যবহার করার মতো ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা বাড়ছে। এর কারণ অতিরিক্ত ডিভাইসের ব্যবহার। শিশুদের চোখে অতিরিক্ত স্ক্রিন অ্যাক্টিভিটি বড়দের চোখের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে। কারণ তাদের চোখ এখনো পরিপক্ব হয়ে ওঠেনি। কোমল চোখে স্ক্রিনের আলো পড়লে সেটা সহজেই চোখকে আক্রান্ত করে ফেলে।

ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের শিশু বহির্বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স শামীম আরার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ শিশু রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল ও টিভি দেখার কারণে শিশুদের চোখের সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে বলেও মনে করেন তিনি। অন্যদিকে, ঢাকার শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন চিকিৎসা নেওয়া রোগীর শতকরা ৫০ ভাগ শিশু।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, মাত্রাতিরিক্ত ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে শিশুদের দৃষ্টি ক্ষীণ হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। শিশুদের দৃষ্টি প্রসারিত হচ্ছে না। কারণ ওরা বাইরে তাকায়ই না। দীর্ঘক্ষণ স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ আর টিভির সামনে থাকছে। শিশুদের দৃষ্টি ভালো রাখতে তাদের সবুজ দিগন্তে মেশার পরামর্শ দিয়ে ডা. নুজহাত আরও বলেন, শিশুরা কিছুক্ষণ বাইরে খেলবে, ছাদে যাবে, সবুজ দেখবে, পশুপাখির সঙ্গেও সময় কাটাবে। এরপর একটা নির্দিষ্ট সময় তারা গেমও খেলবে। মোটকথা চোখকে বিরতি দিতে হবে। একটু ভিজতে দিতে হবে। নিয়ম করে অল্প সময়ের জন্য ডিভাইস বা টিভি দেখার সময় বেঁধে দিতে হবে; তাহলে শিশুর চোখ ভালো থাকবে।

২০২১ সালে ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গবেষকরা, ঢাকার প্রতি ১০০ জনের শিশু শিক্ষার্থীর ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। সেই গবেষণায় ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৪০ শিক্ষার্থীর চোখেই সমস্যা রয়েছে বলে চিহ্নিত করেন। হাসপাতালের শিশু চক্ষুরোগ ও স্কুইন্ট বিভাগের প্রধান মো. মোস্তফার নেতৃত্বে দলটি ঢাকার ১৯টি স্কুলের ৬ হাজার ৪০১ শিক্ষার্থীর চোখ পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৩০০-এর বেশি শিশুর চোখে ত্রুটি খুঁজে পেয়েছেন তারা। সেই শিশুদের প্রত্যেককে চশমা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এসব শিশু নার্সারি থেকে দশম শ্রেণিতে পড়ে। ঢাকার তুলনায় ঢাকার বাইরে এই হার কিছুটা কম।

ইস্পাহানি ইসলামিয়া হাসপাতালের চিকিৎসক ড. ফরিদা জেসমিন আমার দেশকে বলেন, দীর্ঘক্ষণ চোখে চাপ পড়ায় বদলে যাচ্ছে শিশুদের চোখের মণির আকার। ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায়ই এর প্রধান কারণ। ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতির কারণে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে পারে বলেও জানান ডা. ফরিদা জেসমিন। শিশুদের ডিভাইস আসক্তির পেছনে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকা, লেখাপড়ার বাড়তি চাপ, সূর্যের আলোয় শিশুর না আসা, দিগন্তে সবুজের দিকে তাকিয়ে না থাকাকেই দায়ী করেছেন তিনি।

বুধবার সরেজমিন রাজধানীর মনিপুরীপাড়ার বাচা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণির ২৭ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১২ শিক্ষার্থী বিভিন্ন কারণে চোখে চশমা ব্যবহার করছে। এদের একজন জোহান আমার দেশকে বলে, আমি তিন বছর ধরে চশমা ব্যবহার করছি। আরেকজন শিক্ষার্থী নীলয় বলে, আমি ব্ল্যাক বোর্ডের লেখা ঝাপসা দেখি। সে কারণে ডাক্তার আমাকে চশমা দিয়েছে। আমি আগে অনেক বেশি মোবাইলে গেমস খেলতাম। ডাক্তার নিষেধ করার পর এখন বেশি গেমস খেলি না।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে শিশু চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আশিকুর রহমান আকন্দ বলেন, বর্তমানে বাবা-মায়েরা শিশুদের বিবেচনা ছাড়াই নিজের মোবাইল ব্যবহার করতে দেন অথবা বিনোদনের জন্য ‘ট্যাব’ কিনে দেন। অবসর কিংবা পড়াশোনার ফাঁকে শিশুরা তাতে নানা ধরনের গেমস খেলে। দীর্ঘ সময় চোখ স্ক্রিনে রাখার ফলে স্ক্রিন থেকে আসা রশ্মি শিশুদের চোখের ক্ষতি করছে এবং চোখ স্থির হয়ে থাকার কারণে চোখ শুকনো হয়ে যায়, ফলে চোখের বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দেয়। কোমল চোখে স্ক্রিনের আলো পড়লে সেটা সহজেই চোখকে আক্রান্ত করতে পারে। ফলে সে দূরের অথবা কাছের বস্তু ঝাপসা দেখে অথবা স্পষ্টভাবে দেখতে পায় না। এই রোগটাকে বলা হয় চোখের ক্ষীণদৃষ্টি সমস্যা। এই রোগে আক্রান্ত হলে পেছনের বা দূরের কোনো জিনিসই স্পষ্ট দেখতে পায় না শিশুরা।

ফার্মগেট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম শ্রেণির ক্লাস শিক্ষিকা জেনি রোজারিও আমার দেশকে বলেন, বাচ্চাদের মোবাইল, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ডিভাইসের হাত থেকে বাঁচাতে, ছেলেবেলা থেকেই তাদের ছবি আঁকা, গণিত শিক্ষা, নাচ, গান, লুডু, ক্রিকেট খেলাসহ নানা ধরনের খেলায় অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। অর্থাৎ যে বাচ্চা যেটা শিখতে আগ্রহী, তাকে সেটাই করতে দিতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন