সৌদি আরবের নির্ধারিত কোটার আওতায় বাংলাদেশ থেকে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রতি বছর পবিত্র হজ পালনের সুযোগ রয়েছে। আগ্রহী হজযাত্রীদের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে নিবন্ধন করতে হয়। আগামী বছরের হজের প্রাথমিক নিবন্ধন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
তবে বরাবরের মতো এবারও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে হজে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদেরও দেশে ফিরে এসে নিবন্ধন ও হজযাত্রা সম্পন্ন করতে হয়। এতে অতিরিক্ত সময়, ব্যয় এবং দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে ভোগান্তি বাড়ে বলে অভিযোগ প্রবাসীদের। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সৌদি আরবের নির্দেশনা না থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা ঠিক নয় বলে অভিযোগ প্রবাসীদের। বাংলাদেশ সরকার অযৌক্তিকভাবে এতদিন প্রবাসীদের সরাসরি হজের সুযোগ দেয়নি বলেও তারা মন্তব্য করেন।
তবে বর্তমান সরকারের আমলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রবাসী নেতারা সরকার ও হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাব ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং এ বিষয়ে সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
গত ১৩ জুলাই ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ-১ শাখা থেকে প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের (এনআরবি) জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। এতে বলা হয়, ২০২৭ সালের হজের প্রাক-নিবন্ধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং প্রবাসীরা সরকারি অথবা বেসরকারি— যেকোনো ব্যবস্থাপনায় হজে যেতে পারবেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ই-হজ সিস্টেমে প্রাক-নিবন্ধনের সময় প্রবাসীদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট আকারের ছবি, হোয়াটসঅ্যাপ-সক্ষম মোবাইল নম্বর এবং বাংলাদেশের একটি ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিতে হবে। একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি একটি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়া প্রবাসী হিসেবে তথ্য প্রদান, বসবাসরত দেশের নাম উল্লেখসহ বৈধ আবাসনের নথি আপলোড করতে হবে। নির্ধারিত হজ প্যাকেজ নির্বাচন করে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে এবং সৌদি সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী হজে অংশ নিতে হবে।
তবে প্রবাসীদের অভিযোগ, নিবন্ধনের সুযোগ থাকলেও তাদের বাংলাদেশে ফিরে সেখান থেকে সৌদি আরব যেতে বাধ্য করা হয়, যা অতিরিক্ত ব্যয় ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ পরিষদের সিনিয়র জয়েন্ট সেক্রেটারি ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মাওলানা আনিসুর রহমান এ বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, প্রবাসীদের নিজ নিজ দেশ থেকে সরাসরি সৌদি আরবে গিয়ে হজ পালনে ধর্মীয় কোনো বাধা নেই। যুক্তরাজ্যসহ অধিকাংশ দেশেও এ বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাহলে কেন প্রবাসীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশ হয়ে হজে যেতে হবে?
তিনি জানান, ২০২৫ সালের হজে বাংলাদেশের জন্য প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার হজযাত্রীর কোটা বরাদ্দ থাকলেও হজ পালন করেছেন মাত্র ৮৭ হাজার ব্যক্তি। অর্থাৎ প্রায় ৪০ হাজার কোটা অব্যবহৃত ছিল। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশি ব্যয়বহুল স্থানীয় হজ প্যাকেজ ও সীমিত কোটার কারণে নিবন্ধন করতে পারেন না। তাদের অনেকেই দ্বৈত নাগরিক অথবা বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকারী।
তার ভাষ্য, এসব প্রবাসীর অনেকেই বাংলাদেশি হজ প্যাকেজে অংশ নিতে আগ্রহী। কারণ, এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হজ করার সুযোগ তৈরি করে এবং বাংলা ভাষায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে গিয়ে সেখান থেকে সৌদি আরবে গিয়ে হজ পালন করার বাধ্যবাধকতা থাকায় আগ্রহ অনেকটাই কমে যায়। অথচ সরকার উদ্যোগ নিলে বৈধ হজ ভিসা, সঠিক নিবন্ধন ও অনুমোদিত ভ্রমণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রবাসীরা তাদের বর্তমান ঠিকানা থেকেই সরাসরি সৌদি আরব যেতে পারেন।
মাওলানা আনিসুর রহমান আরো বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশি হজ প্যাকেজে নিবন্ধিত কয়েকজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বৈধ হজ ভিসা নিয়ে সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে সৌদি আরবে গেছেন। সেখানে বাংলাদেশি কাফেলার সঙ্গে হজ সম্পন্ন করে তারা নিজ দেশে ফিরে গেছেন। এতে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা হয়নি। এতে প্রমাণ হয়, সঠিক ভিসা, ফ্লাইটের তথ্য, বিমানবন্দরে গ্রহণের ব্যবস্থা এবং অনুমোদিত হজ এজেন্সির সমন্বয় থাকলে সরাসরি ভ্রমণ বাস্তবে সম্ভব হতে পারে। তাই এ ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক ও সরকার-অনুমোদিত কাঠামোর আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
প্রতি বছর বিভিন্ন দেশের কয়েক হাজার প্রবাসী পবিত্র হজ পালন করেন জানিয়ে এই নেতা বলেন, প্রবাস থেকে সরাসরি হজে যেতে পারলে জনপ্রতি চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ও ভোগান্তিও কমবে। ই-হজ সিস্টেমের মাধ্যমে প্রবাস থেকেই নিবন্ধন ও অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব হওয়ায় বাংলাদেশি হজযাত্রীর সংখ্যাও বাড়বে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাবের মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার আমার দেশকে জানান, প্রবাসীদের সরাসরি হজের সুযোগ আমরাও চাই। এ বিষয়ে ধর্মমন্ত্রীও নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন। এ বছর থেকে যাতে এই সুযোগ চালু হয়, আমরা সেই তৎপরতা চালাচ্ছি।
ধর্মমন্ত্রণালয়ের হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আয়াতুল ইসলাম গতকাল শুক্রবার জানান, প্রবাসীদের সরাসরি হজের সুযোগের বিষয়টি আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি। এ বিষয়ে আমরা চিঠিও দিয়েছি।
হজ অধিশাখার যুগ্মসচিব ড. মঞ্জুরুল হক জানান, প্রবাসীদের হজসংক্রান্ত নির্দেশনা প্রতি বছর দ্বিপক্ষীয় হজ চুক্তির সময় সৌদি সরকার দিয়ে থাকে। এ বছরের নির্দেশনা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ হজ অফিসের মাধ্যমে দেশটির হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


