প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব এবং জনপ্রশাসন সচিব পদ নিয়ে। এছাড়াও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব পদে নতুন মুখ আসবে, না চুক্তিভিত্তিক হবেÑসেটি নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
চলতি মাসেই শেষ হচ্ছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহছানুল হকের দুবছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ। অপরদিকে গত ২৯ জুলাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খানকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এছাড়াও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলামকে চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়েছে। বয়স ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী তাকে অবসরে পাঠানো হয়। গত ২৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
সচিবালয়ে গুঞ্জন উঠেছে, জনপ্রশাসন সচিব এহছানুল হকের মেয়াদ শেষ হলে সেখানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সালেহ আহমেদকে চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আব্দুস সাত্তার মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বে আসতে পারেন। অথবা আরো এক বছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ বাড়িয়ে নাসিমুল গনিকে আবারও মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে রাখা হতে পারে এবং মুখ্য সচিবের পদে আসতে পারেন নতুন মুখ।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকারের প্রশাসন।
বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার গঠনের পর মাঠ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা,
বিভিন্ন অফিসে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আকস্মিক পরিদর্শন সারা দেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। এছাড়া জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের বড় পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। একসঙ্গে ১৭৯ উপসচিবকে পদোন্নতি দিয়ে যুগ্ম সচিব করা হয়েছে। এর মধ্যে এক প্রজ্ঞাপনে ১৭২ জন এবং আরেক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, হাইকমিশন ও বিদেশে কর্মরত দপ্তরে দায়িত্ব পালনকারী সাত উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনে এটাই একসঙ্গে সবচেয়ে বড় পদোন্নতি। তবে পদোন্নতির তালিকায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিতর্কিত ভূমিকায় থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। একই ব্যক্তিকে একদিকে অবসরে পাঠানো, অন্যদিকে অবসরের পর পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে অবসরে যাওয়ার পর যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়া সেই কর্মকর্তার পদোন্নতি বাতিল করে করে সরকার।
সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ভুল সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তাদের ভাষ্য, কীভাবে এ ধরনের ত্রুটি ঘটেছে, তা তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া ২২ সচিব
বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আব্দুস সাত্তার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহছানুল হক, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মকসুমুল হাকিম চৌধুরী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্লাহ ভূইয়া, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সালেহ আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (সচিব) ইউসুফ হোসাইন, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, ভূমি আপিল বোর্ডের সচিব আব্দুল্লাহ আল বাকী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) সালাহউদ্দিন নাগরী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল আই মোহাম্মদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব দেলোয়ার হোসেন, বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (সচিব) ড. আবদুস সবুর, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মসিউর রহমান, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুজ্জোহা, রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সরওয়ার আলম এবং বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের ওয়াকফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবদুল আউয়াল মজুমদার আমার দেশকে বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর। যদি প্রধানমন্ত্রী মনে করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের জন্য আব্দুস সাত্তার নির্ভরযোগ্য, তাহলে তো আর প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। এ সরকারের আগেও মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে তিনবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হয়েছিল, এটা নতুন কিছু নয়।
তিনি বলেন, প্রথমত প্রধানমন্ত্রী কাউকে নির্ভরযোগ্য মনে করলে আর প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে না। দ্বিতীয়ত, যারা রেগুলার আমলা আছেন, এখান থেকে যাকে যেখানেই দেওয়া হোক, তার বিরুদ্ধে অন্যরা এমন বিষোদ্গার ও অবান্তর অভিযোগ করেন যে, সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। এখানে সরকার বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের পদোন্নতি দেয়। তাকে তো সরকারপ্রধান চেনেন না, মন্ত্রীদেরও চেনার কথা নয়। তখন সরকার চেষ্টা করবে যাদের চেনে, তাদের ওই পদগুলোতে বসাতে।
আবদুল আউয়াল মজুমদার আরো বলেন, রেগুলার (নিয়মিত) আমলাদের এই রাগারাগি, গালাগালি, হিংসা-বিদ্বেষ ও মিথ্যাচার যদি বন্ধ না হয়, তাহলে তাদের সরকারের আস্থায় নেওয়ার কথা নয়। আমি হলেও নিতাম না। এ কারণে সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় দলীয় পদধারী ১২ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান সরকারের এই সাবেক কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ ভালো বেশকজন কর্মকর্তাকে ‘বিএনপি’ তকমা দিয়ে বঞ্চিত করে। বর্তমান সরকার এখন তাদের প্রতি একটু গুরুত্ব দিতেই পারে, তাতে অসুবিধার কিছু নেই। সাবেক এই সচিব আরো বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে চাকরি করেছেন বলেই যে কেউ আওয়ামী লীগার, এটাও ঠিক নয়। তাহলে আওয়ামী লীগ আমলে কি সব পদ খালি থাকত? কোনো কর্মকর্তার দরকার ছিল না। এজন্য সে সময়কার কর্মকর্তাদের বাছাই করতে হবে। সে সময় কিছু দলবাজ, দাঙ্গাবাজ কর্মকর্তা ছিলেন, আবার কিছু পেশাদার ও ভালো কর্মকর্তাও ছিলেন। যারা সৎ, দক্ষ ও পেশাদার, তাদের পদোন্নতি দেওয়া দরকার বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবদুল আউয়াল মজুমদার।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এখন সচিব পর্যায়ের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। গত ২৩ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিবসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবের পদ ছাড়া বাকি ১১ পদে গ্রেড-২ পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


